ঘাতক বজ্রপাত : প্রয়োজন সতর্কতা ও গণসচেতনতা

মো. জহির আলম শাহীন

মতামত

গত ২৭ এপ্রিল সারা দেশের কয়েকটি জেলার ১৫ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। যা আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়। বর্তমান

2026-05-15T05:23:42+00:00
2026-05-15T05:23:42+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
ঘাতক বজ্রপাত : প্রয়োজন সতর্কতা ও গণসচেতনতা
মো. জহির আলম শাহীন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ৫:২৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
গত ২৭ এপ্রিল সারা দেশের কয়েকটি জেলার ১৫ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। যা আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়। বর্তমান সময়ে ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে বেড়েছে বজ্রপাতের তীব্রতা। এসব বজ্রপাতে মাঠেঘাটে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ।  বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাসে বাংলাদেশ ও পার্শ^বর্তী অঞ্চলে হঠাৎ করে কালো মেঘে বজ্রবৃষ্টিসহ প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হয়। 

যাকে আমরা কালবৈশাখী ঝড় বলে থাকি। এই ঝড়ের সঙ্গে তাণ্ডব চালায় বজ্রপাত, কেড়ে নেয় মানুষের প্রাণ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়। তবে সম্প্রতি বছরগুলোতে এ প্রকোপ ও প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। 

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব বজ্রপাতের খবর বাংলাদেশের দুর্যোগ সংস্থার কাছে পৌঁছায় না। বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী গত ১২ বছরে বা এক যুগে বজ্রপাতে ৩ হাজার ৪২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

বজ্রপাতে মানুষ মারা যাওয়ার ব্যাপকতা উপলব্ধি করে বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের মে মাসে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে ঘোষণা করে। আসলে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো বন্ধ করার সুযোগ নেই তবে সতর্কতা ও সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে  মৃত্যুর হার কমানো যায়। 

কেন এত বজ্রপাত : বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বেশি বজ্রপাত হয়। প্রকৃতির কিছু নিয়মের কারণে বাংলাদেশে মার্চ মাস হতে জুন মাস পর্যন্ত যে ঝড়বৃষ্টি হয় তার মাঝেই বেশি বজ্রপাত হয়। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাস বাংলাদেশের আকাশকে ঢেকে দেয়। 

চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে সেই বাতাস ওপরে উঠে যায়। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস। এ দুই বাতাসের সংঘর্ষে তৈরি হয় বজ্রমেঘ। এর ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, পাবনা, রংপুর, রাজশাহী, টাঙ্গাইল এলাকায় বেশি বজ্রপাত হয়। বাংলাদেশের মধ্যে সুনামগঞ্জ ১৩৭টি খোলা ছাট বড় হাওড় রয়েছে। তাই এ  জেলায়ই বেশি মানুষ মারা যায়। 

বজ্রমেঘ চেনার উপায় : আকাশের দক্ষিণ-পূর্ব বা উত্তর-পশ্চিম কোণে যদি অস্বাভাবিক উঁচু মেঘ দেখা যায়,  সেই মেঘ যদি ক্রমশ ওপরে উঠতে থাকে সেটাই বজ্রমেঘ। এ মেঘ ভূপৃষ্ঠ থেকে ৮ কিলোমিটার থেকে ১২ কিলোমিটার আবার ১৮ কিলোমিটার থেকে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত ওপরে উঠতে পার। আবার ১৮ কিলোমিটার থেকে ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত ওপরে এ মেঘকে বলা হয় কিউমুলোনিয়াস। এই মেঘেই জন্ম নেয় ঘাতক বজ্রপাত। এমন মেঘ দেখলেই অতি তাড়াতাড়ি নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। 

যেভাবে বজ্রপাত সৃষ্টি হয় : বজ্রপাত হলো বায়ুমণ্ডলের পুঞ্জীভূতস্তর বিদ্যুতের এক বিশাল ও প্রচুর শক্তিশালী নিঃসরণ। মূলত একটি বিশাল বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়া। বায়ুমণ্ডলে যখন ঘন কালো মেঘ জমা হয় তখন মেঘ আর মেঘ ঘর্ষণ সৃষ্টির ফলে স্থির বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয় এবং বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়। মেঘের ভেতরে থাকা জলীয়বাষ্প যখন ওপরে ওঠে, তখন বরফকণা বা তুষারের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ মেঘের ওপরের অংশে পজিটিভ এবং নিচের অংশে নেগেটিভ চার্জ জমা হয়। 

প্রচুর পরিমাণ পজিটিভ বা ধনাত্মক চার্জ ও নেগেটিভ বা ঋণাত্মক চার্জ পরস্পরকে আকর্ষণের ফলে আলোর ঝলকানি সৃষ্টি হয়। এ সময় মেঘের নিচের অংশের ঋণাত্মক চার্জ খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভূপৃষ্ঠে তখন ইলেকট্রিকগুলো ছেড়ে দেয়। ফলে ভূপৃষ্ঠে তখন ধনাত্মক চার্জ সম্পন্ন হয়। আর এভাবেই দুটি বিপরীত চার্জের প্রবাহের ফলে প্রচুর তাপশক্তিসহ আলোর ঝলকানি ভূপৃষ্ঠে পতিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় বজ্রপাত।

বাংলাদেশের কোথায় এবং কেন বেশি বজ্রপাত : ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশ বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা। বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর হতে আসা শীতল বাতাস সংমিশ্রণের কারণে বাংলাদেশে বেশি বজ্রপাত হয়। বিশেষ করে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চাল যেমন- সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা জেলাগুলোতে বেশি বজ্রপাত হয়। 

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্চ হতে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে বেশি বজ্রপাত হয়। প্রায় ৯৩ শতাংশই ঘটে এ সময়ে। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, পাহাড়, জঙ্গল কেটে ফেলা, তার সঙ্গে উঁচু বড় গাছ যেমন- তাল ও বটগাছ ইত্যাদি গাছপালা বিনষ্ট বজ্রপাতের বড় কারণ।

প্রাণহানির দায়ভার কার : বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠা বাংলাদেশই শুধু দায়ী নয়। আবহাওয়া পরিবর্তনের বড় একটি কারণ হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে শক্তিশালী কিউমুলোনিবাস মেঘ তৈরি করে। 

তা ছাড়া তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বেড়ে গেলে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেড়ে যায় ১০ থেকে ১২ ভাগ। পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে বজ্রপাত বছর বছর বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ কোনোভাবেই দায়ী নয়। এ জন্য দায়ী বৃহৎ শিল্প উন্নয়ন দেশ। 

কার্বন নিঃসরণ বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণে বিশ্বে প্রথম অবস্থান হলো চীন। দেশটি বায়ুমণ্ডলে ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ করে থাকে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি ১১ থেকে ১২ শতাংশ নিঃসরণ করে। তৃতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ ভারত। দেশটি ৭ থেকে ৮ শতাংশ হারে কার্বন নিঃসরণ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়া যৌথভাবে চতুর্থ স্থানে আছে।
 
কী কাজে আসছে প্রকল্প : ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ বজ্রপাত এলাকায় তালগাছ লাগানোর প্রকল্প গ্রহণ করে। যুক্তি ছিল তালগাছ খুবই উঁচু। বজ্রপাত সবচেয়ে উঁচু জিনিসেই আঘাত হানে। লম্বা তালগাছ বজ্র টেনে মাটিতে পৌঁছে দেবে। ফলে প্রাণহানি করবে। 

এরই প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে সরকারিভাবে সুনামগঞ্জে ৪০ হাজার তালগাছের চারা রোপণ করা হয়। দেখাশোনা, যত্নের অভাব, অবহেলার কারণে শতকোটি টাকার তালগাছের বর্তমানে কোনো অস্তিত্বই নেই। আবহাওয়া অধিদফতর ২০১৮ সালে বজ্রপাতের আগাম সংকেত দিতে ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮টি জায়গায় বসিয়েছিল লাইটিং ডিটেকশন সেন্সর। 

এগুলো বর্তমানে সচ্ছল আছে কি না কেউ জানে না। একইভাবে ২০২২ সালে সুনামগঞ্জ হাওড় এলাকায় ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮টি বজ্রনিরোধক দণ্ড বা লাইটিনিং অ্যারেস্টার বসানো হয়। বলা হয়েছিল ১০০ মিটার ব্যাসের মধ্যে বজ্রপাত হলে তা টেনে মাটিতে নামিয়ে আনবে। ফলে প্রাণহানি কমবে। 

আপনার জীবন আপনাকে বাঁচাতে হবে : বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অবশ্যই সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে এবং মেঘের ডাক শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। আর যারা ঘরে আছেন তারা ঘর থেকে বের হবেন না। 

কখনোই বড় বা উঁচু গাছের বা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে আশ্রয় নেবেন না। বজ্রপাত উঁচু জিনিসেই আগে আঘাত আনে। যদি খোলা মাঠে থাকা অবস্থায় বজ্রপাত শুরু হয় তা হলে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে মাথা নিচু করে কানে হাত দিয়ে বসে থাকবেন। বজ্রপাতের সময় ঘরে থাকলে কম্পিউটার, ফ্রিজ, টিভি, চার্জে থাকা মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। 

বজ্রপাত যেহেতু জাতীয় দুর্যোগ তাই ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি সরকারিভাবে কিছু দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। হাওড়ে মাঝেমধ্যে উঁচু জায়গা তৈরি করে তাতে তালগাছ, বটগাছ, নারিকেল গাছ লাগাতে হবে। হাওড় বা খোলা জায়গায় নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর আধুনিক বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন করতে হবে। 

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর কর্তৃক আগাম সতর্ক বার্তা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অতিদ্রুত প্রান্তিক কৃষক, জেলেদের মাঝে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এরাই দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের চাবিকাঠি। তাই তাদের সুরক্ষা রাষ্ট্রের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বজ্রপাত কোনো একক সমস্যা নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট, যার সমাধান হতে হবে সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী। বজ্রপাত থামানো যাবে না। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি বা মৃত্যু কমানো সম্ভব। 

লেখক : শিক্ষক 


  বিষয়:   বজ্রপাত  সতর্কতা  গণসচেতনতা 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: