পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসলেও সিলেটের মানুষের মনে উৎসবের আমেজের চেয়ে উদ্বেগই এখন বেশি। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসা ভারতীয় গবাদি পশুর বন্যায় একদিকে যেমন দিশেহারা স্থানীয় খামারিরা, অন্যদিকে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ না করার বিষয়ে কওমি মাদরাসাগুলোর অনড় অবস্থানে তৈরি হয়েছে নতুন এক সংকট। পশুর বাজার থেকে শুরু করে চামড়া শিল্প-সবখানেই এখন অনিশ্চয়তার মেঘ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন রাত থেকে ভোর পর্যন্ত অবৈধভাবে ঢুকছে শত শত ভারতীয় গরু ও মহিষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী চক্র এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে এসব পশু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের চেকপোস্টের সামনে দিয়ে এসব গাড়ি চলে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাসিন্দারা।
ফলে সারা বছর ধার-দেনা করে পশু লালন-পালন করা প্রান্তিক খামারিরা এখন ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে চরম সংশয়ে। শুধু খামারিরাই নন, লোকসানের ঝুঁকিতে আছেন জেলার অর্ধশতাধিক পশুর হাটের ইজারাদাররা।
মশাহিদ মিয়া নামে এক পাইকার বলেন, লাভের আশায় আড় গরু আনলাম, এখন ভারতীয় গরুতে বাজার সয়লাব। আমাদের আসল টাকা উঠবে কি না, তা নিয়েই আমরা চিন্তিত।
যদিও সিলেট জেলা পুলিশ দাবি করেছে, তারা 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেলুর রহমান জানান, চোরাচালান দমনে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং কোনো পুলিশ সদস্যের অবহেলার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সীমান্তের সংকটের মধ্যেই যোগ হয়েছে চামড়া নিয়ে বড় দুঃসংবাদ। দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদে এবার সিলেট বিভাগের কওমি মাদরাসাগুলো কোরবানির চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি ‘সিলেট কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ’ এক সংবাদ সম্মেলনে এই ‘নীরব বিদ্রোহের’ ঘোষণা দেয়।
দেশে কোরবানির মোট চামড়ার প্রায় ৭০ শতাংশ সংগ্রহ করে থাকে কওমি মাদ্রাসাগুলো। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, চামড়া বিক্রি করে লবণের খরচও ওঠে না। সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
মাদরাসাগুলোর এই সিদ্ধান্তে তিন ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কোরবানিদাতারা সাধারণত মাদরাসাগুলোতে চামড়া দিয়ে দায়মুক্ত হন। এবার মাদ্রাসা চামড়া না নিলে বিকল্প কোনো কাঠামো না থাকায় যত্রতত্র চামড়া পড়ে থেকে পচে দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণ ছড়াতে পারে।
এছাড়া মাদরাসার ‘লিল্লাহ ফান্ড’ বা এতিম তহবিলের বড় অংশ আসত এই চামড়া বিক্রির অর্থ থেকে। চামড়া সংগ্রহ বন্ধ থাকলে হাজার হাজার এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীর আবাসন ও খাবারের নিশ্চয়তা হুমকির মুখে পড়বে।
পাশাপাশি কাঁচা চামড়া সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ট্যানারিগুলো কাঁচামাল সংকটে পড়বে এবং জাতীয় সম্পদের বিশাল অপচয়সহ চামড়া পাচারের ঝুঁকি বাড়বে।
এদিকে ঈদের আনন্দ যখন দুয়ারে, তখন সিলেটের খামারি এবং সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্ত থেকে বাজার পর্যন্ত কঠোর নজরদারি এবং চামড়া শিল্পের বিপর্যয় ঠেকাতে অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সিন্ডিকেট ভেঙে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে এবারের কোরবানির অর্থনীতি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলায় রূপ নিতে পারে।
সময়ের আলো/জোই