সাতকানিয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে উজাড় পাহাড়

জাহেদুল ইসলাম, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম)

সারাদেশ

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প। কোটি টাকার বরাদ্দ। মাঠে চলছে স্পিলওয়ে পুনর্নির্মাণের কাজ। আর সেই কাজের আড়ালে প্রকাশ্যেই কাটা হচ্ছে পাহাড়। ট্রাকে

2026-05-16T01:03:36+00:00
2026-05-16T01:03:36+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সাতকানিয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে উজাড় পাহাড়
জাহেদুল ইসলাম, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ১:০৩ এএম 
সাতকানিয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে উজাড় পাহাড়। ছবি : সময়ের আলো
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প। কোটি টাকার বরাদ্দ। মাঠে চলছে স্পিলওয়ে পুনর্নির্মাণের কাজ। আর সেই কাজের আড়ালে প্রকাশ্যেই কাটা হচ্ছে পাহাড়। ট্রাকে ট্রাকে পরিবহন করা হচ্ছে পাহাড়ের মাটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সব কিছুই হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায়, এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর ‘নীরব প্রশ্রয়ে’। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সোনাইছড়ি এলাকায় চলমান একটি সরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এখন এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। 

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। বরং সরকারি প্রকল্পেই ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড় কেটে আনা মাটি। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ ভূমিধসের ঝুঁকি। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মাজেদ এন্টারপ্রাইজ’ দিনের পর দিন পাহাড় কেটে মাটি নিয়ে গেলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছেন। আর এ নীরবতাকেই ‘প্রশ্রয়’ হিসেবে দেখছেন পরিবেশ সচেতন নাগরিকরা।

সোনাকানিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন বলেন, সোনাইছড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি উন্নয়ন প্রকল্পে নেওয়ার বিষয়টি জেনে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। ঠিকাদারদের লোকজন পাহাড় কাটা মাটি ট্রাকে করে কিছু মাটি তাদের কাজে ব্যবহার করেছে। এটার জন্য আমি তাদের বকাবকি করেছি। তারা বলেছেন, স্থানীয় লোকজন নাকি তাদেরকে ধসে পড়া মাটি এক্সকেভেটর দিয়ে সরিয়ে দিতে বলেছেন। এ জন্য তারা এ কাজ করেছেন। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান স্যারকে জানিয়েছি।

অভিযোগের বিষয়ে এলজিইডির সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে বলেন, ঠিকাদার পার্শ্ববর্তী জমি থেকে মাটি নিতে পারবেন, কিন্তু পাহাড় কেটে মাটি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। এমনটি হয়ে থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রকল্পেই পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করা যাবে না। পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় সাতকানিয়ার সোনাইছড়ি উপ-প্রকল্পে স্পিলওয়ে পুনর্নির্মাণ কাজ’ বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাজেদ এন্টারপ্রাইজ।

প্রকল্পটির প্যাকেজ নম্বর এসপি-২৫২৫৬ এবং টেন্ডার আইডি ১০৪০৯৪৩। সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ১ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৪ টাকা ৭৫ পয়সা। কাজ শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি। আগামী ২৯ মে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতির পাশাপাশি এখন আলোচনায় এসেছে আরেকটি বিষয়- কাজে ব্যবহৃত মাটির উৎস। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ মাটি আশপাশের পাহাড় কেটে সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সোনাইছড়ি এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ ধরেই পাহাড় কাটার কার্যক্রম চলে আসছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসকেভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে ট্রাকে মাটি তোলা হয়। পরে সেই মাটি নিয়ে যাওয়া হয় সরকারি প্রকল্প এলাকায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, এটা কোনো গোপন বিষয় না। সবাই দেখছে। রাতভর এসকেভেটর চলে। ট্রাকের পর ট্রাক মাটি যায়। সরকারি কাজের জন্যই এই মাটি নেওয়া হয়েছে। তা হলে প্রকৌশলীরা কিছু জানেন না- এটা বিশ্বাসযোগ্য না।

আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, সরকার পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে এত অভিযান চালায়। কিন্তু সরকারি প্রকল্পেই যদি পাহাড়ের মাটি ব্যবহার হয়, তা হলে সাধারণ মানুষ কী বার্তা পাবে? স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় কাটার ফলে ইতিমধ্যে কয়েকটি স্থানে মাটি ধসে পড়েছে। বর্ষা শুরু হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড় শুধু মাটির ঢিবি নয়; এটি একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পাহাড় কাটা হলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং বৃষ্টির সময় ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে অতীতে পাহাড় ধসের ঘটনায় বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার কারণে এসব দুর্ঘটনা বাড়ছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সোনাইছড়ি এলাকায় যেভাবে পাহাড়ের ঢাল কেটে মাটি নেওয়া হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

এএডি/


  বিষয়:   সাতকানিয়া  উন্নয়ন  প্রকল্প  পাহাড়  চট্টগ্রাম 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: