পুলিশের অস্ত্র ব্যবহারের ‘ভয় ও দ্বিধা’ কাজে লাগাচ্ছে সন্ত্রাসীরা

নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা

সারাদেশ

নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। মাদকবিরোধী অভিযান, আসামি গ্রেফতার কিংবা সাধারণ

2026-05-16T15:37:59+00:00
2026-05-16T15:37:59+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
পুলিশের অস্ত্র ব্যবহারের ‘ভয় ও দ্বিধা’ কাজে লাগাচ্ছে সন্ত্রাসীরা
নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ৩:৩৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। মাদকবিরোধী অভিযান, আসামি গ্রেফতার কিংবা সাধারণ টহল কার্যক্রম পরিচালনার সময় পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যরা বারবার সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। গত নয় মাসে এমন ঘটনায় অন্তত ৪০ জন পুলিশ ও র‍্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। সরকারি অস্ত্র ছিনতাই, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া এবং বাহিনীর সদস্যদের মারধরের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

গত ৫ মে ফতুল্লার মাসদাইর বয়ালিয়া খাল এলাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয় র‍্যাব-১১ এর একটি দল। র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় একদল সশস্ত্র ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে এসআই নাজিবুল, কনস্টেবল মাহি ও ইব্রাহিম আহত হন। গুরুতর আহত নাজিবুলকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পরে পাল্টা অভিযানে র‍্যাব বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে ছিল পিস্তলের গুলি, ছুরি, চাপাতি, রামদা, চাইনিজ কুড়াল, গাঁজা ও ইয়াবা। এ ঘটনায় ১৩ জনকে আটক করা হয়।

একই দিন ভোরে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরোয়ানাভুক্ত আসামি শামীম মিয়াকে গ্রেফতার করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। একদল লোক পুলিশ সদস্যদের ঘিরে ধরে হামলা চালালে রূপগঞ্জ থানার ওসিসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন। হামলাকারীরা পুলিশের একটি ওয়াকিটকি ও দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।

এই সুযোগে আসামি শামীম মিয়া পালিয়ে যান। পরে কেন্দ্রীয় যুবদল তাকে বহিষ্কার করে। পরবর্তীতে পুলিশ ও র‍্যাবের যৌথ অভিযানে শামীমের স্ত্রীসহ ১২ জনকে আটক করা হয়।

এরপর ৬ মে ফতুল্লার দেওভোগ হাশেমবাগ এলাকায় চাঁদাবাজি ও লুটপাটের অভিযোগে তিনজনকে আটক করে থানায় নেওয়ার সময় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামিদের ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এতে এক পুলিশ সদস্য আহত হন।

ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম বলেন, আটক ব্যক্তিদের থানায় নেওয়ার পথে কয়েকজন বাধা দেয় এবং পরে আসামিদের ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।

গত ৩০ এপ্রিল বন্দর উপজেলার হাবিব নগর এলাকায় ছিনতাইয়ের তদন্ত করতে গিয়ে হামলার শিকার হন মদনগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই সোহেল রানা ও কনস্টেবল ফয়সাল হোসেন। ১৪ থেকে ১৫ জনের একটি দল তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে কনস্টেবল ফয়সাল গুরুতর আহত হন এবং তাকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হামলাকারীরা পুলিশের একটি সরকারি শটগান ছিনিয়ে নিলেও পরে সেটি উদ্ধার করা হয়।

শহর এলাকাতেও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ মার্চ উকিলপাড়া রেললাইন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশ সদস্যদের মারধর করে তাদের ব্যবহৃত সামগ্রী ছিনিয়ে নেয় আসামিরা। এ ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেফতার করে।

এর আগে ৯ মার্চ নিতাইগঞ্জ এলাকায় টহলরত অবস্থায় শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির এক কর্মকর্তার সরকারি পিস্তল ছিনতাই করা হয়। এ সময় তিনি আহত হন। পরে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার এবং একজনকে গ্রেফতার করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ শহরের জিমখানা বস্তি ও রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তি এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

গত বছরের ২২ অক্টোবর জিমখানায় আসামি ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতের শিকার হন মদনগঞ্জ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্য কামরুজ্জামান। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ২৮ ডিসেম্বর একই এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়ে পুলিশের আরেকটি দল। ওই ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। একইভাবে রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তিতেও অভিযান চালাতে গিয়ে নিয়মিত বাধার মুখে পড়ছে পুলিশ।

চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি আড়াইহাজারে ওয়ারেন্টভুক্ত এক নারী আসামিকে গ্রেফতার করতে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকে পুলিশের একটি দল। হামলায় ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং আসামিকে ছিনিয়ে নেয় তার সহযোগীরা।

গত বছরের ২৯ অক্টোবর আড়াইহাজারের মারুয়াদী এলাকায় গ্রাম্য বিরোধ থামাতে গিয়ে আক্রান্ত হয় পুলিশ। দুর্বৃত্তরা আড়াইহাজার থানার ওসির সরকারি ডাবল কেবিন পিকআপ ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে র‍্যাব একজনকে গ্রেফতার করে।

আরও একটি আলোচিত ঘটনা ঘটে গত সেপ্টেম্বরে সোনারগাঁর বৈদ্দেরবাজার খেয়াঘাট এলাকায়। হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি মহসিনকে হাতকড়া পরা অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার সময় ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি দল পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয়। এতে ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। পাশাপাশি স্থানীয় এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পরে পুলিশ হাতকড়া উদ্ধার করলেও আসামিকে আর গ্রেফতার করতে পারেনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও আতঙ্ক তৈরির উদ্দেশ্যেই সন্ত্রাসীরা পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার মোস্তফা কামাল রাশেদ বলেন, আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্যই তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টার্গেট করছে, যাতে জনগণ মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে না পারে। পাশাপাশি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের কিছু ষড়যন্ত্রকারীও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এ ধরনের কাজ করছে।

অন্যদিকে, বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে মনোবল কমে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেও অস্ত্র ব্যবহারে অনেক সদস্য দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকেই পুলিশের মনোবল অনেকটা ভেঙে গেছে। সন্ত্রাসীরা হামলা করলে পুলিশ নিজেদের অস্ত্র ব্যবহার করতে সাহস পাচ্ছে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অস্ত্র ব্যবহারের ওপর মৌখিক চাপ থাকায় আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেও পুলিশ অস্ত্র ব্যবহার করতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, আইন অনুযায়ী অস্ত্র ব্যবহারে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হলে বাহিনীগুলো আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে।

আরবিএন 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: