বেশি টাকা পেয়ে মধ্যমকুড়া গ্রামের কৃষকরা প্যারাগন এগ্রোর কাছে বিক্রি করেছেন তাদের দুই ফসলি জমি। কিন্তু এ কারণে যে আরও চড়া মূল্য ফেরত দিতে হবে, তা বুঝে উঠতে পারেননি। আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষেরা এখন ভুক্তভোগী। ডিম, মুরগি খাদ্য ও জৈব সার উৎপাদন, এ তিনে মিলে শিল্প প্রতিষ্ঠানটির বর্জ্য এবং উৎকট দুর্গন্ধে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। মাঠে নেই আয়ের একমাত্র উৎস বোরো ধান। ধান গাছের গোড়া পঁচে এবং চিটা হয়ে মাঠজুড়ে এখন বিস্তীর্ণ হাহাকার। মারাত্মক দূষণের শিকার হয়ে বর্ষায় হারিয়ে গেছে দেশীয় মাছের বিচরণ। আশপাশের মাঠে এখন আর শোভা পায় না হাঁসের দল। শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রো নামের প্রতিষ্ঠানটি এখন স্থানীয়দের গলার কাঁটা।
জানা গেছে, ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয়দের কাছ থেকে তুলনামূলক উচ্চ দামে দুই ফসলি জমি কিনতে শুরু করে তারা। এরপর মাটি ভরাটের কাজ। প্রথমে পরিবেশ অধিদফতর শেরপুর কার্যালয় থেকে ৭ একর জমিতে অবস্থানগত ছাড়পত্র নেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরে তৈরি করে অবকাঠামো। এরপর লেয়ার মুরগি থেকে ডিম উৎপাদনের ছাড়পত্র গ্রহণ করে প্যারাগন। প্রতিদিন ১৪ লাখ ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত প্যারাগন ইতোমধ্যেই ৭ লাখ ডিম উৎপাদন শুরু করেছে। তবে এর পাশাপাশি ফিড উৎপাদন ও জৈব সার উৎপাদনের অনুমোদনও নেয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি ঘন্টায় তিন হাজার লিটার বর্জ্য শোধনের জন্য ইটিপি বা বর্জ্য শোধনাগার তৈরির অনুমোদনও নেয়। যদিও ২৮ একর জমির উপর দাড়িয়ে থাকা প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রোর বর্জ্য শোধনের জন্য এতটুকু শোধনাগার যথেষ্ট নয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারপরও মাত্র এক হাজার লিটার বর্জ্য শোধনের ইটিপি নামকাওয়াস্তে স্থাপন করে ডিম, ফিড এবং জৈব সার উৎপাদন শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিদিন লালন-পালন হচ্ছে প্রায় ২১ লাখ মুরগী। ফলে এর বর্জ্য ও বিষ্ঠার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ। ৩-৪ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় এর অসহনীয় দুর্গন্ধ। একই সঙ্গে প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রোর উত্তর পাশের ফসলি মাঠের পানির সঙ্গে প্যারাগনের ক্যামিক্যাল ও বিষ্ঠার নির্যাস মিশ্রিত দূষিত পানি মিশে প্রবাহিত হয় দক্ষিণে থাকা ভাটির ফসলি জমিগুলোতে। এতে করে প্যারাগন-এর দক্ষিণে থাকা অন্তত একশ একর জমির বোরো আবাদ একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে।
শুধু তাই নয়, দূষিত পানি যে-সব পুকুরে গিয়ে মিশছে সেসব পুকুরের মাছ মরে যাচ্ছে। মাঠ থেকে হারিয়ে গেছে দেশীয় জাতের মাছ। ওইসব মাঠে বন্ধ হয়ে গেছে হাঁস পালন। অন্যদিকে, প্যারাগনের অসংখ্য ভারি যানবাহনের চাপে নির্মাণের পরপরই কাকরকান্দি চৌরাস্তা মোড় থেকে মধ্যমকুড়া পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার পাকা সড়ক ভেঙে চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় প্যারাগনের ভারি যানবাহন সরু রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকায় স্থানীয়রা ভোগেন যানজটেও।
ঘাকপাড়া গ্রামের কৃষক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে প্যারাগন কোম্পানি। যখন এদিকে বাতাস বয়, তখন দুর্গন্ধে বাড়িতে থাকা যায় না।’
বিন্নিবাড়ি গ্রামের শহর আলী জানান, ‘প্যারাগণের দুর্গন্ধের কারণে এখানে কেউ সমন্ধ করতে চায় না।’
একই গ্রামের ভুক্তভোগী খোরশেদ আলম বলেন, ‘পচাঁ দুর্গন্ধে ভাত খাওয়া যায় না। পরিবেশ এতই নষ্ট হয়ে গেছে যে, মাছি দিয়ে ভরে গেছে।’
প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রো এর সহকারী-মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘আমরা ঘণ্টায় এক হাজার লিটার বর্জ্য শোধনে সক্ষম একটি ইটিপির কার্যক্রম শুরু করেছি। আরও একটি প্রস্তুত করা হচ্ছে। এছাড়াও কনভেয়ার বেল্ট এর মাধ্যমে ড্রায়ার পদ্ধতিতে জৈব সার উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা হবে। এসবের পর দূষণ থাকবে না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করা হবে।’
শেরপুর পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পরিদর্শন করে ঘন্টায় এক হাজার লিটার বর্জ্য শোধনের জন্য তাদের ইটিপি পেয়েছি, যা যথেষ্ট নয়। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছ থেকে ঘন্টায় তিন হাজার লিটার বর্জ্য শোধনের ইটিপি স্থাপনের অনুমোদন নিয়েছে এবং এর কার্যক্রম চলছে। আশা করছি, পুরো ইটিপি স্থাপন হয়ে গেলে এবং ড্রায়ার পদ্ধতি চালু হলে বর্জ্য থাকবে না।’
/মহু