মেঘনা নদী খননের নামে অবৈধ বালু উত্তোলন

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি

সারাদেশ

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদী খননের (ড্রেজিং) নামে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এতে নদীভাঙনের মুখে পড়ে বিলীনের শঙ্কায়

2026-05-17T16:18:19+00:00
2026-05-17T16:18:19+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
মেঘনা নদী খননের নামে অবৈধ বালু উত্তোলন
সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ৪:১৮ পিএম 
সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীতে বালু উত্তোলন। ছবি : সময়ের আলো
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদী খননের (ড্রেজিং) নামে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এতে নদীভাঙনের মুখে পড়ে বিলীনের শঙ্কায় রয়েছে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী আনন্দবাজার হাটসহ নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ জনপদ। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদীর তীর ঘেঁষে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার বসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলায় পাড় দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে মুন্সিগঞ্জের ‘চাকদা ড্রেজিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রাইভেট) লিমিটেড’ মেঘনা নদী খননের কার্যাদেশ পায়। তবে নিয়ম অনুযায়ী দিনের বেলায় অনুমোদিত কাটিং ড্রেজারের মাধ্যমে কাজ করার কথা থাকলেও, রাতের আঁধারে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সোনারগাঁয়ের মোমেন সিকদারের নেতৃত্বে এবং স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়া প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এই অবৈধ ব্যবসা চালানো হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের মেঘনা নদীর তীরবর্তী আনন্দবাজার হাট সংলগ্ন অংশে বালু ফেলে বেড়িবাঁধ তৈরি করা হয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় ড্রেজারের বিকট শব্দ। ২০ থেকে ৩০টি শক্তিশালী খনন যন্ত্র (ড্রেজার) দিয়ে সারা রাত ধরে নদীর তলদেশ থেকে বালু লুট করা হচ্ছে।

এলাকাবাসীর দাবি, প্রতিদিন রাতে ১০ থেকে ১২টি বড় ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এই চক্রের সঙ্গে সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের সদস্য ও পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুদ রানা, মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল বারেক এবং নলচর গ্রামের হাবিবুল্লাহর ছেলে রবিউল্লাহ রবিসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী জড়িত। সোনারগাঁ ও মেঘনা উপজেলার এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে আনন্দবাজার, ছনপাড়া, টেকপাড়া, খামারগাঁও ও পূর্ব দামোদরদী এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। গত বর্ষায় এই চক্রের কারণে পিরোজপুর ইউনিয়নের নুনেরটেক গ্রামের প্রায় ৩০টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।


আনন্দবাজার হাটটি শুধু একটি বাণিজ্যকেন্দ্রই নয়, এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ এখানে কেনা-বেচা করতে আসেন। হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, নদীর তীর ঘেঁষে বালু তোলার ফলে মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। ভাঙন শুরু হলে হাটের দোকানপাট, রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি নদীতে তলিয়ে যাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈদ্যেরবাজারের এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাতে ড্রেজারের শব্দে ঘুমানো যায় না। প্রতিবাদ করলে মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়। পুলিশ-প্রশাসন সবই জানে, কিন্তু এই ব্যবসার ভাগ সবার কাছে যায় বলে কেউ কিছু বলে না।

স্থানীয় সচেতন মহল ও ব্যবসায়ীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, রাতে আর বালু কাটতে দেওয়া হবে না। এরপরেও অবৈধ চেষ্টা চালানো হলে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বালু সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

অভিযুক্ত মোমেন সিকদারের ভাই মামুন বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র নিয়ম অনুযায়ী ইজারাদার নদী খননের কাজ করছে। আমার বড় ভাই শুধু কাজটি দেখভাল করছেন। যদি কেউ রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু কাটে, তার দায়ভার আমাদের নয়। পারলে নিউজ করে ব্যবস্থা নেন।

যুবদল নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুদ রানা জানান, আমি নদী থেকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নই। সেখানে বালু কাটার জন্য আমার ড্রেজার ভাড়া দেওয়া হয়েছে মাত্র।

সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি শাহেদ কায়েস বলেন, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমরা স্থানীয় বালু সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’ পরিচালনা করেছিলাম। সেই আন্দোলনের ফলে চরটি রক্ষা পেলেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। ২০১৪ সাল থেকে ওই এলাকায় বালু উত্তোলন বন্ধ ছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, আবারও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে আনন্দবাজার সংলগ্ন নুনেরটেক এলাকায় রাতের অন্ধকারে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে। এর ফলে জনবসতি, পরিবেশ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মক হুমকির মুখে। আমরা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

সোনারগাঁ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম সারোয়ার জানান, ইউএনও স্যারের নেতৃত্বে আমরা অভিযানে যাই। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র অনুমতি সাপেক্ষে নদী খননের কাজ চলছে। তবে রাতের আঁধারে বালু লুটপাটের বিষয়টি আমার জানা নেই। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, রাতের বেলা নদীতে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ এবং জনবল সংকটও রয়েছে। তবুও আমরা চেষ্টা করছি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির সময়ের আলোকে বলেন, রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, অবিলম্বে এই শক্তিশালী বালুখেকো সিন্ডিকেটকে কঠোর হস্তে দমন না করা হলে অচিরেই সোনারগাঁয়ের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে শতবর্ষী আনন্দবাজার হাটসহ বহু গ্রাম।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   মেঘনা নদী  খনন  অবৈধ  বালু উত্তোলন 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: