দখল-দূষণ ও অবহেলায় মরছে আলাই নদী

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

সারাদেশ

একসময় যে নদীর বুকে নির্বিঘ্নে ভেসে বেড়াত মাছধরা নৌকা, এখন নাব্য হারিয়ে সেই নদীতে জমে আছে পলি আর সেখানে দেদারসে

2026-05-17T17:40:48+00:00
2026-05-17T17:42:09+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
দখল-দূষণ ও অবহেলায় মরছে আলাই নদী
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ৫:৪০ পিএম  আপডেট: ১৭.০৫.২০২৬ ৫:৪২ পিএম
আলাই নদী । ছবি : সময়ের আলো
একসময় যে নদীর বুকে নির্বিঘ্নে ভেসে বেড়াত মাছধরা নৌকা, এখন নাব্য হারিয়ে সেই নদীতে জমে আছে পলি আর সেখানে দেদারসে আবাদ হচ্ছে ধান। দখল, দূষণ আর দীর্ঘদিনের চরম অবহেলায় গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী আলাই নদী এখন তীব্র অস্তিত্বের লড়াইয়ে অবতীর্ণ। নদী বাঁচলে বাঁচবে কৃষি, বাঁচবে জীববৈচিত্র্য— এই অমোঘ সত্যকে উপেক্ষা করার মাশুল দিচ্ছে স্থানীয় লক্ষাধিক মানুষ।

শুকনো মৌসুমে, বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিল মাসে গাইবান্ধা শহরের পুলবন্দী এলাকায় গেলে চোখে পড়ে এক বেদনার ছবি। যেখানে প্রমত্তা নদী থাকার কথা, সেখানে পলির বুকে জেগে উঠেছে সবুজ ধানক্ষেত। কোথাও নদী দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ ঘরবাড়ি, আবার কোথাও বাজারের দোকানের বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে নদীর বুকে। দুর্গন্ধে ভরা কালো পানি গিলে খাচ্ছে নদীর শেষ অস্তিত্বটুকু। এটাই আজকের আলাই নদীর দৃশ্য— যা একটি মৃতপ্রায় নদীর নীরব আর্তনাদ। 

ঘাঘট নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে ৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আলাই নদী বয়ে চলত গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালী, সাঘাটার ভূতমারা হয়ে গোবিন্দগঞ্জের রাখালবুরুজ ইউনিয়ন পর্যন্ত। এরপর এটি মিশত কাটাখালী নদীতে। কিন্তু ঘাঘট ও আলাইয়ের সংযোগস্থলে অপরিকল্পিতভাবে স্লুইসগেট বসানোর পর থেকেই নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে পড়ে। 

পলি জমতে জমতে নদীর তলদেশ এখন এতটাই ভরাট যে, বর্ষার পানিও স্বাভাবিকভাবে ধারণ করতে পারে না নদীটি। উপরন্তু, বর্ষায় সেই পানি উপচে পড়ে তীরবর্তী এলাকাকে প্রতি বছর ভয়াবহ বন্যার কবলে ফেলে। নদীর তলদেশে জমতে থাকা পলিতে তখন শুধু নদী মরে না— সে মরতে মরতে আশপাশের জনপদকেও ডোবায়। একটি জীবন্ত নদীর এই মৃত্যু হঠাৎ ঘটেনি; এর পেছনে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে চলা অযত্ন, অব্যবস্থাপনা আর সীমাহীন উদাসীনতার দীর্ঘ ইতিহাস।

স্থানীয় প্রবীণরা জানান, মাত্র কয়েক দশক আগেও আলাই নদী ছিল এ অঞ্চলের কৃষি ও প্রাণের মূল উৎস। নদীর পানি দিয়ে তিনটি ইউনিয়নের হাজার হাজার একর জমিতে সেচ দেওয়া হতো। নদী থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত শতাধিক জেলে পরিবার। নদীতীরে গবাদিপশু পালন ছিল খুবই সাধারণ দৃশ্য। 

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মনিরুল হাসান সেই স্মৃতি হাতড়ে বলেন, সদর উপজেলার বোয়ালী ও বাদিয়াখালী ইউনিয়নের কয়েক হাজার কৃষক এই নদীর পানিতে চাষাবাদ করতেন, যা এখন আর চোখে পড়ে না। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী মতিয়ার রহমান যখন বলেন যে তিনি গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে নদীর বুকেই ধান ফলাচ্ছেন, তখন খুব সহজেই বোঝা যায় এই নদী কতটা গভীরভাবে তার আদি পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, নদী মরে যাওয়ার পেছনে তিনটি মূল কারণ পরস্পরের সাথে গেঁথে আছে— দখল, দূষণ এবং খননের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা ও ঘরবাড়ি। কেউ কেউ সরাসরি নদীর বুকে জমে থাকা পলিতে চাষাবাদ করছেন। শহরের ড্রেনের ময়লা পানি এসে মিশছে নদীতে, আর নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা দোকান ও হোটেলের বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে নদীর বুকে। 

স্থানীয় দোকানি মধু মিয়া নিজেও স্বীকার করেন যে, এই বর্জ্য নিষ্কাশনের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তারা নদীতেই ফেলছেন। ফলে পানি কুচকুচে কালো হয়ে গেছে, তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে সবচেয়ে বড়ো অবহেলাটি— এই নদীটি আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও সরকারিভাবে খনন বা সংস্কার করা হয়নি। বছরের পর বছর পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, কিন্তু তা উদ্ধারে কেউ হাত দেয়নি।

এই তিন সংকট মিলে তৈরি করেছে এক মারাত্মক দুষ্টচক্র। নদীতে পানি না থাকায় কৃষকরা এখন পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ সেচ যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন, ফলে বাড়ছে ফসলের উৎপাদন খরচ। 

কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, শুকনো মৌসুমের শুরুতেই নদী শুকিয়ে যায়, তাই বিকল্প পন্থায় আবাদ করতে গিয়ে খরচের বোঝা বহন করতে হয়। ষাট বছর বয়সি কৃষক আয়নাল মিয়ার কণ্ঠে তাই এক গভীর অসহায়তা— একসময়ের প্রাচুর্যময় নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে, আর তাঁরা নদীপাড়ের বাসিন্দারাও যেন সেই একই সংকটে ডুবছেন।

নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের গুরুত্ব কেবল মাছ ধরা বা সেচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূ-উপরিস্থ পানির প্রধান উৎস হিসেবে নদ-নদী ও জলাধারগুলো কৃষির মূল চালিকাশক্তি। নদীর নাব্যতা থাকলে বর্ষার পানি ধরে রাখা যায় এবং শুকনো মৌসুমে তা সেচের কাজে লাগানো যায়, ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনে আর্সেনিক দূষণ ও জমি বসে যাওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি বিপদ রয়েছে— যা বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। 

এর পাশাপাশি নদী ও জলাশয় বর্ষায় বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখে, দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা করে, জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুজ্জীবিত করে ভবিষ্যতের জল সংকট কমায়। আলাই নদীর মতো ছোট নদীগুলো তাই কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকার নয়, বরং সমগ্র কৃষি-পরিবেশ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাদিয়াখালী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য নুর আলম বলেন, নাব্য সংকটের কারণে নদীতে পানি নেই, স্থানীয়রা সেখানে বাধ্য হয়ে নানা ফসল আবাদ করছেন। তবে নদটি জরুরিভিত্তিতে খনন করে নাব্যতা ফেরাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি জোর দাবি জানান। 

পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার আহ্বায়ক ওয়াজিউর রহমান রাফেল সরাসরি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নদী শাসন ও সংস্কার না হলে একসময় হয়তো এই নদটি চিরতরে মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। তাই পরিবেশের অস্তিত্ব রক্ষায় খনন ও সংস্কার এখনই জরুরি।


এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, আলাই নদীর খননসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকল্প তালিকা পাঠানো হয়েছে এবং অনুমোদন পেলে নদী রক্ষায় যা যা প্রয়োজন তা দ্রুত করা হবে। কিন্তু স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন— অনুমোদনের ফাইল আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যে একটি জীবন্ত নদী আর কতদিন অপেক্ষা করতে পারে? প্রতিটি বর্ষা যাচ্ছে আর পলি জমছে, প্রতিটি শীত আসছে আর নদী আরও সংকুচিত হচ্ছে।

গাইবান্ধার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, করতোয়া ও ঘাঘটের মতো বড়ো নদীর পাশাপাশি আলাইয়ের মতো ছোট নদীগুলোই আসলে স্থানীয় কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। এই নদীগুলো বাঁচলে বাঁচবে প্রান্তিক কৃষক, বাঁচবে দেশীয় মাছ এবং বজায় থাকবে প্রকৃতির ভারসাম্য। আলাই নদীর কান্না তাই আজ শুধু গাইবান্ধার একার নয়; সারা দেশে ছোট নদীগুলোর ওপর চলা দীর্ঘ অবহেলা আর প্রশাসনিক উদাসীনতার এটি একটি বাস্তব চিত্র মাত্র। একটি নদী মরলে শুধু পানি কমে না— নিভে যায় তার ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকার আলো। সেই আলো ফিরিয়ে দিতে হলে কাগজে-কলমে নয়, দ্রুত মাঠে নামতে হবে— এবং তা এখনই। 

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   দখল  দূষণ  অবহেলা  আলাই নদী  গাইবান্ধা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: