আজকের ব্রিটেনের সমসাময়িক রাজনীতির ভবিষ্যৎ ইতিহাসের কোনো খসড়া পাতা নয়, বরং এটি ছিল ফ্রান্সের চতুর্থ প্রজাতন্ত্রের বাস্তব চিত্র। ১৯৪৬ সালে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এ ফরাসি শাসনব্যবস্থা ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত চলেছিল কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
অবশেষে, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত সেই শাসনব্যবস্থা জেনারেল শার্ল দ্য গলের হাতে নতুন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দায় হস্তান্তর করে নিজেদের রাজনৈতিক যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়েছিল।
বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার অবশ্য এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নন। অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
ব্রিটেনের বর্তমান এ রাজনৈতিক অস্থিরতার সমান্তরাল কোনো উদাহরণ খুঁজতে বিদেশি নজিরগুলোর দিকেই তাকাতে হবে, কারণ খোদ ব্রিটিশ ইতিহাস-এর কোনো জুতসই দৃষ্টান্ত দিতে অক্ষম।
‘দ্য ইম্পসিবল অফিস?’ গ্রন্থের লেখক অ্যান্থনি সেলডন, যিনি বিগত ৩০০ বছরের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রিত্বের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন, তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন— ‘বর্তমান সময়ের মতো এমন অস্থির কাল আগে কখনো আসেনি।’
অষ্টাদশ শতাব্দীর ১৭৬০-১৭৭০ দশক এবং উনবিংশ শতাব্দীর ১৮২৭-১৮৩৭ দশকে এমন একটি সময় পার হয়েছিল—যখন ঠিক এই হারেই একের পর এক প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছিল।
তবে ২০১৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ব্রিটেনবাসী ছয়জন— এবং চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় শীঘ্রই হয়তো সপ্তম— প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় নিতে দেখছেন, যা শীর্ষ নেতৃত্বের সামগ্রিক রদবদলের দিকে তাকালে এক ‘অনন্য ও নজিরবিহীন’ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। এমনকি স্টারমার-পরবর্তী কোনো রদবদলের আগেই এই সংক্ষিপ্ত সময়ে ব্রিটেন ৮ জন চ্যান্সেলর (অর্থমন্ত্রী) এবং ৯ জন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেখে ফেলেছে।
ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রস, ঋষি সুনাক, কিয়ার স্টারমার এবং এরপর একটি কঠিন উপনির্বাচনে জয়ী হতে পারলে হয়তো অ্যান্ডি বার্নহ্যাম—এই তালিকার দিকে চোখ বুলালে প্রথম যে ভাবনাটি মাথায় আসে, তা কোনো টেকসই বা সুদূরপ্রসারী কাজের কথা নয়, বরং চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক চরম রাজনৈতিক উন্মাদনার চিত্র। আর এই উন্মাদনা মোটেও কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়।
সাবেক ক্যাবিনেট সেক্রেটারি গাস ও’ডোনেল খুব কাছ থেকে ক্ষমতার তিনটি পালাবদল প্রত্যক্ষ করেছেন : মার্গারেট থ্যাচার থেকে জন মেজর, টনি ব্লেয়ার থেকে গর্ডন ব্রাউন এবং ব্রাউন থেকে ক্যামেরন। ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিরোধী দলীয় নেতার সঙ্গে ‘অ্যাক্সেস টক’ বা নীতি নির্ধারণী আলাপের সময়— ডেভিড ক্যামেরন হোয়াইটহলে (ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্র) কী কী পরিবর্তন আনতে চান, সে বিষয়ে তাকে ব্রিফ করেছিলেন।
ও'ডোনেল বলেন, সে সময় ক্যামেরন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন : ‘আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?’ জবাবে ও'ডোনেল বলেন, ‘এমন মন্ত্রীদের নিয়োগ দিন যারা অন্তত একটি নির্দিষ্ট দায়িত্বে দীর্ঘদিন বহাল থাকবেন, যাতে তারা নিজেদের কাজের পরিধি ও মন্ত্রণালয়ের খুঁটিনাটি বোঝার ন্যূনতম সুযোগটুকু পান।’
মন্ত্রীদের এই 'মিউজিক্যাল চেয়ার' খেলার মাঝেই কীভাবে বড় বড় জাতীয় ইস্যুর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগুলো টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হয়েছিল, তা স্মরণ করার সময় ও'ডোনেলের কণ্ঠে এক ধরণের ক্লান্তি ও হতাশা ঝরে পড়ছিল। যেমন পেনশন এমন একটি খাত, যা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি রাখে; কারণ একজন নাগরিককে তাঁর পুরো জীবনজুড়ে এর জন্য পরিকল্পনা ও সঞ্চয় করতে হয় এবং নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। অথচ ও'ডোনেল স্মৃতিচারণ করে বলেন, এক পর্যায়ে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই পেনশন খাতেই ৯ জন মন্ত্রীকে দায়িত্ব বদল করতে দেখা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের একটি অত্যন্ত স্পষ্ট কিন্তু কম আলোচিত নেতিবাচক পরিণতি হলো, এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারের একটি বিশাল অংশের অন্যান্য মন্ত্রীদেরও পরিবর্তন ঘটে। যেকোনো নতুন প্রধানমন্ত্রী স্বাভাবিকভাবেই তার নিজের মতো করে মন্ত্রিসভা গঠন করতে চাইবেন।
আর রাজনীতির এই পিচ্ছিল মই বেয়ে যিনি শীর্ষে পৌঁছানোর চাতুর্য রাখেন, তিনি অনুগতদের পুরস্কৃত করতে এবং অবাধ্য বা চতুর রাজনীতিকদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে—সরকারের জুনিয়র পদগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগটি কখনোই হাতছাড়া করবেন না।
/কেএইচও