পাঁচ মিনিটের ঝড়ে গৃহহীন দুই শতাধিক পরিবার

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

রাতের শেষ প্রহর। গাইবান্ধার চরাঞ্চলের মানুষ তখনও ঘুমে। সোমবার (১৮ মে) ভোর সাড়ে চারটা। হঠাৎ পশ্চিম দিক থেকে ধেয়ে আসে

2026-05-18T19:57:39+00:00
2026-05-18T19:57:39+00:00
 
  শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
পাঁচ মিনিটের ঝড়ে গৃহহীন দুই শতাধিক পরিবার
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ৭:৫৭ পিএম 
শতশত কাঁচা ও টিনের ঘর দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে। ছবি : সময়ের আলো
রাতের শেষ প্রহর। গাইবান্ধার চরাঞ্চলের মানুষ তখনও ঘুমে। সোমবার (১৮ মে) ভোর সাড়ে চারটা। হঠাৎ পশ্চিম দিক থেকে ধেয়ে আসে প্রচণ্ড কালবৈশাখী। মাত্র পাঁচ মিনিটের সেই তাণ্ডবে ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার চারটি গ্রাম পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। শতশত কাঁচা ও টিনের ঘর দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে। উপড়ে যায় বিশাল বিশাল গাছ। ঘরের চাল উড়ে যায় বহু দূরে। সকাল হতে না হতেই দুই শতাধিক পরিবার হয়ে পড়ে ছাদহীন, নিঃস্ব; ঘর হারিয়ে এই মানুষগুলোর আশ্রয় এখন শুধু খোলা আকাশ।   

স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোমবার ভোরের আঁধার তখনও পুরোপুরি কাটেনি। কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই পশ্চিম দিক থেকে তীব্র বেগে ছুটে আসে কালবৈশাখী। ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের চৌমোহন ও চর কাউয়াবাঁধা গ্রাম, এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নের বুলবুলির চর এবং সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের খারজানি চরে মাত্র পাঁচ মিনিটে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যায় ঝড়টি। বাতাসের তীব্রতায় শতশত ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে, অসংখ্য গাছপালা উপড়ে যায় এবং কমপক্ষে দশজন আহত হন। 

ভোর সাড়ে ৪টার দিকে পশ্চিম দিক থেকে প্রচণ্ড বেগে বাতাস শুরু হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাত্র ৫ মিনিটের ঝড়ে গ্রামের ঘরবাড়ি তছনছ হয়ে যায়।বললেন ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত চর কাউয়াবাঁধা গ্রামের বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন। 

সকাল হতেই চরাঞ্চলে নেমে আসে বুকফাটা কান্না আর হাহাকার। যে ঘরটুকু ছিল একমাত্র আশ্রয়, তা এখন মাটিতে মিশে গেছে। খারজানি চরের তোফাজ্জল মিয়া বলেন, ঝড়ে ঘরের চাল উড়িয়ে নিয়ে বহুদূরে ফেলেছে। এখন থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। ঘরের আসবাবপত্র ও খাবার সব নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছি।

একই চরের কুলছুম বেগমের ঘরে রাখা ৪০ হাজার টাকা ও পোশাক-পরিচ্ছদ ঝড়ে উড়ে গেছে। কীভাবে আবার মাথার উপর ছাদ তুলবেন, জানেন না তিনি। চোখে জল নিয়ে বলেন, এখন আবার নতুন করে শুরু করার সাধ্য আর নেই। শিশু সন্তান কোলে নিয়ে জবা বেগমও দিশেহারা- রাত কাটানোর জায়গা নেই, রান্না করার উপায় নেই। ছোট্ট শিশুটিকে কী খাওয়াবেন, সে চিন্তাতেই কাটছে সময়। 

ঝড়ে ঘরের নিচে চাপা পড়েন চৌমুহনী চরের জাহিদুলের স্ত্রী। স্থানীয়রা উদ্ধার করে তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। আহত আরও অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন স্থানীয় পর্যায়ে। 

খারজানি চরের প্রবীণ বাসিন্দা নজরুল ইসলামের বয়স সত্তর বছর। বন্যা, নদীভাঙন- প্রকৃতির অনেক রোষের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। কিন্তু এমন ঝড় আগে কখনো দেখেননি বলে জানান। তার কণ্ঠে ক্ষোভও ঝরে পড়ে। বলেন, বন্যা, ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা চরের মানুষগুলোর এই দুর্যোগে খোঁজ নিতেও আসেননি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তার অভিযোগ, দুর্যোগের বেশ কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নির্বাচিত কেউ চরে পা দেননি। 


প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চারটি গ্রামে শতাধিক ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং আরও শতাধিক আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কামারজানি ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আসাদুজ্জামান জানান, ঝড়ে কিছু ঘর সরাসরি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে জানানো হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, নিরাপদ পানি ও আশ্রয়ের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস সালাম জানান, তার সংস্থা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং জরুরি মানবিক সহায়তা দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।  

ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অবগত। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা ও ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে বলে তিনি জানান। 

তবে চরাঞ্চলের মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, তালিকা হবে কবে, আর সাহায্য পৌঁছাবে কখন? যাদের মাথার উপর ছাদ নেই, পেটে খাবার নেই, ছোট শিশু কোলে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন- এই রাতটা তাদের কীভাবে কাটবে? চরাঞ্চলে ঝড়-বন্যা-ভাঙন নিত্যসঙ্গী- তবু প্রতিটি দুর্যোগের পর একই প্রশ্ন ফেরে : কে দাঁড়াবে এই মানুষগুলোর পাশে? 


/ইউএমএইচ

  বিষয়:   গাইবান্ধা  ঝড় 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: