‘আপনি ওই রুমে তালা দিয়েছেন, ওই রুমে আমিই ওদের উঠিয়েছি। আপনি রুম খুলে দিবেন কিনা এইটা বলেন। আপনাকে আধা ঘণ্টা সময় দিলাম। আপনি তালা খুলে দিলে দেন, নাহলে আমি নিজে গিয়ে তালা ভেঙে ফেলব। ’
মঙ্গলবার (১৯ মে) প্রাধ্যাক্ষকে এভাবেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নবাব আব্দুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষকে মোবাইল ফোনে সরাসরি হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতির বিরুদ্ধে।
ঘটনা সূত্রে জানা যায়, প্রাধ্যক্ষের কোনো অনুমতি না নিয়েই দুই অনাবাসিক ছাত্রকে হলের ১৫৮ নং কক্ষে তোলেন লতিফ হল ছাত্রদলের সভাপতি মুরাদ। মঙ্গলবার বিষয়টি জানতে পেরে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আতাউল্লাহ ওই দুই ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অফিসে ডাকেন। কিন্তু তারা প্রাধ্যক্ষের অফিসে না গিয়ে রুমে তালা দিয়ে হলের বাইরে যায়। ঘটনার পর প্রাধ্যক্ষের নির্দেশে হলের কর্মচারীরা সেই কক্ষে আরেকটি তালা লাগিয়ে দেয়। এরপর দুপুরে ছাত্রদল নেতা মুরাদ প্রাধ্যক্ষের মোবাইলফোনে কল দিয়ে রুম খুলে দেওয়ার জন্য হুমকি দেন।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে নবাব আব্দুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আতাউল্যাহ বলেন, কাল দুপুর আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। ওপাশ থেকে একজন বলল, স্যার, আমি মুরাদ বলছি, লতিফ হল ছাত্রদলের সভাপতি। আপনি ওই রুমে তালা দিয়েছেন, ওই রুমে আমিই ওদের উঠিয়েছি।’ তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম প্রাধ্যক্ষের কনসার্ন ছাড়া তুমি উঠাইতে পারো? পরে সে বলে ওরা গরিব মানুষ।
তিনি বলেন, এরপর সে আমাকে বলে আপনি রুম খুলে দিবেন কিনা এইটা বলেন। আপনাকে আধা ঘণ্টা সময় দিলাম। আপনি তালা খুলে দিলে দেন, নাহলে আমি নিজে গিয়ে তালা ভেঙে ফেলব। অনেক কথার একপর্যায়ে সে আমাকে বলে আপনি তো আর বেশিদিন নাই স্যার। তখন বললাম, যতদিন আছি, ততদিন তো আমি তো এই হলের প্রভোস্ট তাই না। হলে তো আমার কনসার্ন ছাড়া তুমি উঠাইতে পারো না। পরে বিশৃঙ্খলা এড়াতে আমি তালা খুলে দিতে বলি।
এ দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, ওই হলের ১৫৮ নং কক্ষে বর্তমানে দুইজন অনাবাসিক শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। জানতে চাইলে তারা দুজনেরই এই হলে অ্যালোটমেন্ট রয়েছে বলে জানায়। তাদের মধ্যে এক জন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কামরুজ্জামান আপন ও আরেকজন একই শিক্ষাবর্ষের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী জাবিদ।
কামরুজ্জামান আপন জানান, তার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় হলের উপ-রেজিস্ট্রার করিম আলীর কাছে রুমে ওঠার জন্য তিনি আবেদন করেন। তিনি জানান এই গণ রুমটি ফাঁকা আছে এবং এখানে ওঠার জন্য পরামর্শ দেন। উপ-রেজিস্ট্রারের কথাতেই কামরুজ্জামান এই রুমে ওঠেন বলে দাবি করেন। তবে কামরুজ্জামান ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দফতর সম্পাদক নাফিউল জীবনের অনুসারী বলে জানান।
তবে ওই রুমে থাকতে পরামর্শ দেওয়ার কথাটি অস্বীকার করেছেন হলটির উপ-রেজিস্ট্রার করিম আলী। তিনি বলেন, আমি হলের মধ্যে এক চুল পরিমাণ কিছু করার আগেও সেটা প্রাধ্যক্ষ স্যারকে জানাই। আমি আরও সবসময় রুম খালি করার চেষ্টা করি। তবে ওরা যে বরাদ্দ ছাড়া কীভাবে আছে, সেটা জানি না।
বিষয়টি নিয়ে প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক শাহ হুসাইন আহমেদ মাহদী বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত একটাই, মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টন। সেখানে যারা মেধার বিপক্ষে অবস্থান নেবে, প্রশাসন তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। আমার জানামতে সংশ্লিষ্ট হল প্রাধ্যক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছে। যেহেতু উপাচার্য স্যার দেশের বাইরে আছেন। ফিরলে এই বিষয়ে আলোচনা হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন বলেন, হল প্রাধ্যক্ষ লিখিতভাবে বিষয়টি আমাদের জানিয়েছেন। এটা উপাচার্য আসলে তিনি বিষয়টি দেখবেন। আমি উপাচার্যকে অবহিত করার জন্য তার পিএসের কাছে কাগজটি হস্তান্তর করেছি। তিনি যেহেতু দেশের বাইরে আছেন, ফিরলে আমরা এই বিষয়ে একসঙ্গে কথা বলব।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে নবাব আব্দুল লতিফ হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মুরাদ হোসেনর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল ধরেন নি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, সে (মুরাদ) ফোন দিয়েছে, নাকি অন্য কেউ ফোন দিয়েছে তার সঙ্গে কথা বলে জানবো। মুরাদও এ বিষয়ে আমাকে কিছুই অবহিত করেনি। বিষয়টা আমি টোটালি জানি না। এই নিয়ে আমাদের কাছে এখনো কেউ কোনো অভিযোগ করেনি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল প্রশাসনও বিষয়টি অবহিত করেনি। জানার পরে যদি আবেদন পাই, তাহলে পরবর্তীতে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সময়ের আলো/জোই