ঈদ এলেই বেশিরভাগ মানুষ নিজ গ্রামমুখো হয়। এই গ্রামমুখো হওয়া যেন এক অদ্ভুত নাড়ির টান। এই নাড়ির টানেই মানুষ ঢাকা ছাড়ে। আর ঢাকা থেকে নিজ গ্রামে যাওয়ার জন্য অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে এই জন্য এত বিশাল পরিমাণ মানুষ যখন গ্রামমুখো হয় তখন স্বাভাবিকভাবে দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। তবে দুর্ভোগ কমানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্যান্য বছরের মতো এবারও মানুষের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
এসব পদক্ষেপের ফলে এবারের ঈদযাত্রা কতটা স্বস্তিদায়ক হবে, এটাই এখন দেখার বিষয়। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের মানুষ এখন ঘরমুখো হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই সময়টিতে স্বস্তি ও নির্বিঘ্ন যাত্রার জন্য সরকার বিভিন্ন মহাসড়ক, রেলপথ ও নৌপথে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, রেলওয়ে, সেতু বিভাগ, হাইওয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে যানজট ও ভোগান্তির শঙ্কা এখনও কাটেনি। রাজধানীর বাইরে গাজীপুর, এলেঙ্গা, পদ্মা সেতু ও কুমিল্লা করিডোরে যানজটের কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকায় অতিরিক্ত যানবাহন, অবৈধ পার্কিং, পশুর হাট ও ট্রাফিক অপ্রতুলতা দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের ঝুঁকি বেশি।
হাইওয়ে পুলিশ এই মহাসড়কগুলোয় ৯৪টি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করে সতর্কতা জারি করেছে। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, ভ্রাম্যমাণ টিমের কার্যক্রম ও মনিটরিং চলবে। বরাদ্দকৃত এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে যানজট নিয়ন্ত্রণ, অন্যান্য যানবাহনের চাপ কমানো ও পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত করা। তবে বৃষ্টির কারণে মহাসড়ক মেরামত ও সংস্কারের কাজ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অপরদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে খানাখন্দ ও যানজটের সমস্যা দীর্ঘদিনের। এই রুটে দিনে প্রায় ১৮ থেকে ২২ হাজার যানবাহন চলাচল করে, ঈদের সময় তা বেড়ে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ফলে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও ভোগান্তির আশঙ্কাও বাড়ছে। কুমিল্লার পদুয়ার বাজারসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পদ্মা, যমুনা সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোতেও যানজটের ঝুঁকি রয়েছে। এই সেতুগুলোর টোলপ্লাজা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে যানবাহনের মান ও ফিটনেসের অভাবে দুর্ঘটনা ও দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা অপ্রত্যাশিত নয়। অবৈধ পার্কিং, পশুর হাট ও ট্রাফিক অপ্রতুলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সরকারের প্রস্তুতি হিসেবে মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত, যানবাহনের অবৈধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাপ সামাল দেওয়া, ট্রাফিক নিয়ম মানানো ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা। গার্মেন্টস ও শিল্প-কারখানায় ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তা পুরোপুরি কার্যকর করতে পারলে যানজট কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
রেল ও নৌপথে প্রস্তুতি আরও উন্নত। বাংলাদেশ রেলওয়ে অতিরিক্ত কোচ ও ইঞ্জিন প্রস্তুত করেছে। বিশেষ ট্রেন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু হওয়ার ফলে এই পথগুলোতে স্বস্তি থাকছে। পদ্মা সেতু চালুর পর নদীপথে যাত্রীর চাপ কমে এসেছে, যার ফলে ভ্রমণ-সুবিধা আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, সংস্থাগুলোর সমন্বয়, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি ও সচেতনতা। শুধু মহাসড়কের সংস্কার বা পুলিশি উপস্থিতি যথেষ্ট নয়; বিভিন্ন সংস্থার কার্যকর সমন্বয় ও সচেতনতা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন, সারা বছর মহাসড়ক ও রেলপথের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি, যাতে এ ধরনের ভোগান্তি বারবার না হয়।
যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার কারণে যাতে ঘরমুখো মানুষের ঈদ আনন্দ ম্লান হয়ে না যায়, সে জন্য বিশেষ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে সড়ক-মহাসড়কে যানজট সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই যায়। এ ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন হয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। ঈদযাত্রা যেন সুখকর ও নিরাপদ হয়, এ প্রত্যাশায় সবার সহযোগিতা ও সচেতনতা অপরিহার্য। জনগণের স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তা হলেই ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা হবে আনন্দময় ও নির্বিঘ্ন।
সময়ের আলো/আআ