অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন এবং কার্যকর নিরীক্ষা ব্যবস্থা। একটি দেশের আর্থিক খাত কতটা সুসংগঠিত ও জবাবদিহিমূলক- তা অনেকাংশে নির্ভর করে তার হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে নিরীক্ষা পেশার উন্নয়ন এবং পেশাগত মান রক্ষার ক্ষেত্রে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। বাংলাদেশে নিরীক্ষা পেশার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকান্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।
একইভাবে হিসাববিজ্ঞান পেশায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকান্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং করপোরেট জবাবদিহিতার প্রশ্ন সামনে আসায় নিরীক্ষা ও আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থায় আরও শক্তিশালী তদারকির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে প্রণয়ন করা হয় ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ২০১৫, যার অধীনে গঠিত হয় ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা রাষ্ট্রীয় হিসাববিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানগুলো- দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকান্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকান্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) ওপর তদারকির দায়িত্ব ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের অধীনে আসে।
যার উদ্দেশ্য হিসাব ও নিরীক্ষার মানদণ্ড প্রণয়ন, যথাযথ প্রতিপালন, বাস্তবায়ন এবং পেশাগত কার্যক্রমের তদারকি করা, যাতে আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং পেশাগত তদারকি শক্তিশালী করা যায়। তবে বাস্তবতার বিচারে দেখা যায় যে আইনটির কার্যকারিতা এখনও পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রথমত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন-২০১৫ ধারা ২(১৮) অনুযায়ী ‘পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্ট’ বলতে দুটি পেশাগত প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের বোঝানো হয়েছে- দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)।
তাদের পেশাগত কার্যক্রম যথাক্রমে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অর্ডার ১৯৭৩ এবং কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অর্ডিন্যান্স ১৯৭৭ রহিত করে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস আইন-২০১৮ দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু বাস্তবে নিরীক্ষা কার্যক্রমে প্রায় একক আধিপত্য লক্ষ্য করা যায় আইসিএবির সদস্যদের। আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৭৩ অনুযায়ী নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে মূলত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদেরই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে আইনগতভাবে দুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের ‘পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়নি।
কোম্পানি আইন ১৯৯৪ অনুযায়ী বিধিবদ্ধ নিরীক্ষা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট কর্তৃক সম্পাদন করার বিধান রয়েছে। গত বছর জুন মাসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এবং ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ২০১৫-এর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের লক্ষ্যে, যেসব ক্ষেত্রে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ অনুযায়ী আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা নেই, সেসব ক্ষেত্রে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ২০১৫ অনুযায়ী আয়কর আইন ২০২৩-এর ৭৩ ধারায় সংশোধনী প্রস্তাব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু আইসিএবি কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয়ত এফআরসির অন্যতম দায়িত্ব হলো নিরীক্ষা ও আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থার তদারকি করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, পর্যাপ্ত জনবল এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখনও পুরোপুরি শক্তিশালী হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত নিয়ন্ত্রণ আগের প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের মধ্যেই রয়ে গেছে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অতীতে ঘটে যাওয়া বড় কেলেঙ্কারিগুলো- যেমন হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি, পিকে হালদার-সংক্রান্ত আর্থিক কেলেঙ্কারি, সম্প্রতি নাসা গ্রুপ এবং এস আলম গ্রুপ-সম্পর্কিত বিতর্ক দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট সৃষ্টি করে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কু-ঋণের পরিমাণ ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ। বিষযটি আর্থিক প্রতিবেদনে সম্পদ ও দায় সম্পর্কে সঠিক মতামত দেওযার দায় নিরীক্ষকের ওপর বর্তায়। এসব ঘটনার মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই, নিরীক্ষা স্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সুতরাং বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা, পেশাগত অসমতা এবং আইনগত কাঠামোর কিছু অসামঞ্জস্যতার কারণে এই আইনের পূর্ণ কার্যকারিতা এখনও অর্জিত হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা, নিরীক্ষা পেশায় পেশাগত সমতা নিশ্চিত করা এবং নিরীক্ষা ব্যবস্থায় অধিক স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা।
বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭ অর্থবছর :
ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের কাঠামো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তা হলে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ও পেশাগত সিন্ডিকেট ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হবে না। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আয়কর আইন ২০২৩-এর ৭৩ ধারাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে, যেখানে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ অনুযায়ী বিধিবদ্ধ নিরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্র ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ২০১৫ এর ধারা ২(১৮) অনুযায়ী পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্ট কর্তৃক নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পাদন করে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার প্রস্তাবনা।
এর ফলে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ২০১৫-এর সহিত কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এর সামঞ্জস্য তৈরি হবে, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। সরকার যদি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন-২০১৫-এর মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে না পারে, তা হলে আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এতে দেশের আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল হতে পারে এবং অতীতে সংঘটিত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশে পেশাগত হিসাবরক্ষণ কাঠামোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতে সিএমএ পেশাজীবীরা বিভিন্ন ব্যয় নিরীক্ষার পাশাপাশি সমবায় সমিতি আইন ও ভ্যাট আইনের অধীনে বিধিবদ্ধ নিরীক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া বীমা নিয়ন্ত্রক ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আইআরডিএ) অধীনে লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়াতেও সিএমএ পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ রয়েছে। পাকিস্তানে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সিএমএ পেশাজীবীরা আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা পরিচালনা করে থাকেন। অন্যদিকে কানাডায় পেশাগত হিসাবরক্ষণ কাঠামোকে আরও সমন্বিতভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে। ২০১৪ সালে তিনটি পেশাগত সংগঠন- সিএ, সিএমএ এবং সিজিএ একীভূত হয়ে গঠন করে সিপিএ কানাডা। বর্তমানে এই একীভূত কাঠামোর অধীনে সিপিএ সদস্যরাই নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
এনরন এবং ওয়ার্ল্ডকমের মতো আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারি বিশ্বকে দেখিয়েছে যে দুর্বল নিরীক্ষা ব্যবস্থা এবং অস্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন কত বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ২০১৫ প্রণয়ন সেই অভিজ্ঞতার আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়- এর ন্যায়সংগত ও কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নিরীক্ষা ব্যবস্থা যদি পেশাগত প্রতিযোগিতা ও সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত না হয় এবং যদি সিন্ডিকেট সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারে, তা হলে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে।
তাই আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৭৩-সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে যেখানে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ অনুযায়ী বিধিবদ্ধ নিরীক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই, সেখানে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন-২০১৫-এর ধারা ২ (১৮) অনুযায়ী পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্টদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তবেই জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হবে, নিরীক্ষা খাতে প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বাংলাদেশের আর্থিক খাতে সুশাসন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী