যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধকে ঘিরে একটি গোপন এবং বড় পরিকল্পনার তথ্য সামনে এসেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ইরানের সাবেক কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। ধারণা ছিল, ইরানের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন এবং শাসকগোষ্ঠীর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে একটি বিকল্প নেতা হিসেবে সামনে আনা।
যুদ্ধ শুরুর সময় ইসরায়েল ইরানের রাজধানী তেহরানে আহমাদিনেজাদের বাড়ির কাছে একটি বিমান হামলা চালায়। এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল তার বাড়ির চারপাশে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়া, যাতে তাকে গৃহবন্দি থেকে মুক্ত করা যায়। হামলায় তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর কয়েকজন সদস্য নিহত হন। তার বাড়িতে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও আশপাশের নিরাপত্তা পোস্ট ধ্বংস হয়ে যায়।
এই ঘটনার সময় আহমাদিনেজাদ আহত হন, কিন্তু বেঁচে যান। এরপর কিছুদিন তার অবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। শুরুতে কিছু সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয় তিনি মারা গেছেন, পরে জানা যায় তিনি জীবিত আছেন। তবে এরপর থেকে তাকে খুব বেশি প্রকাশ্যে দেখা যায়নি এবং এখন তিনি কোথায় আছেন তা স্পষ্ট নয়।
আহমাদিনেজাদ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তখন তিনি খুব কট্টর অবস্থানে ছিলেন। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিতেন, এমনকি ইসরায়েলকে ‘মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার’ মতো মন্তব্যও করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জোরালো সমর্থক ছিলেন এবং দেশের ভেতরে বিরোধীদের ওপরও তিনি কঠোর দমন চালিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।
কিন্তু ক্ষমতা ছাড়ার পর তার সঙ্গে ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসকদের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা শুরু করেন। এর ফলে তাকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয় এবং কার্যত গৃহবন্দির মতো অবস্থায় রাখা হয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই ইসরায়েলি হামলা ছিল একটি বড় পরিকল্পনার অংশ। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসন ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে দুর্বল করা। প্রথমে শীর্ষ নেতৃত্বকে আঘাত করা, তারপর দেশে অস্থিরতা তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের দিকে যাওয়া— এটাই ছিল তাদের ভাবনা।
এই পরিকল্পনার মধ্যেই আহমাদিনেজাদকে সম্ভাব্য ‘নতুন নেতা’ হিসেবে বিবেচনা করছিল ট্রাম্প-নেতানিয়াহু। তাদের ধারণা ছিল, তিনি একসময় কট্টর হলেও পরে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাকে ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ধাপে শুধু বিমান হামলাই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরি করে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সক্রিয় করার পরিকল্পনাও ছিল। বিশেষ করে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকেও কাজে লাগানোর চিন্তা করা হয়েছিল, যাতে ইরানের ভেতরে চাপ তৈরি করা যায়।
তবে বাস্তবে এই পুরো পরিকল্পনা সফল হয়নি। যদিও ইরানের কিছু সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ক্ষতি করা সম্ভব হয় এবং শীর্ষ পর্যায়ে বিশৃঙ্খলাও তৈরি করা যায়, কিন্তু রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি। বরং ইরান ধীরে ধীরে আবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এই পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও মতভেদ ছিল। কিছু কর্মকর্তা মনে করতেন, ইরানের মতো বড় ও জটিল দেশে বাইরে থেকে সরকার পরিবর্তন করানো বাস্তবসম্মত নয় এবং এতে বড় ঝুঁকিও তৈরি হয়।
অন্যদিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া মনে করতেন, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগালে এই কৌশল সফল হতে পারত এবং ইরানে নতুন সরকার আনা সম্ভব ছিল।
/ইউএমএইচ