রাশিয়া-চীনের তথাকথিত ‘নো লিমিটস’ সম্পর্কে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এখন এক নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা অন্যদিকে ধীরে ধীরে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা দুই শক্তিধর রাষ্ট্র- রাশিয়া ও চীন।
কয়েক বছর আগেও অনেক বিশ্লেষক মনে করতেন, মস্কো ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক মূলত কৌশলগত সুবিধাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, বিষয়টি এখন আর কেবল স্বার্থের সীমিত সমঝোতা নয় বরং এটি ধীরে ধীরে এমন এক ভূরাজনৈতিক জোটে রূপ নিচ্ছে, যা পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরটিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে ‘ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা’ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মস্কো ও বেইজিংয়ের অবস্থান এখন অনেকটাই সমন্বিত। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রশ্নে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষতার কথা বললেও, বাস্তবে তারা কখনো রাশিয়াকে একঘরে করেনি। বরং বেইজিং বারবার ‘সংলাপ’ ও ‘মূল কারণ সমাধানের’ কথা বলেছে। অন্যদিকে মস্কো দাবি করে আসছে, ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণই এই যুদ্ধের প্রধান কারণ।
চীনের কাছে ইউক্রেন যুদ্ধের আরেকটি কৌশলগত গুরুত্বও আছে। পশ্চিমা সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বড় একটি অংশ এখন ইউরোপীয় যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ কিছুটা হলেও বিভক্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, তাইওয়ান প্রশ্নে ভবিষ্যৎ হিসাব-নিকাশে বেইজিং এই বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাইওয়ান ইস্যুতেও অভিন্ন মত মস্কোর। রাশিয়া ‘এক চীন নীতি’ সমর্থন করে। আর এই নীতির অধীনেই বেইজিং তাইওয়ানকে চীনের ভূখণ্ডের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যেও দুই দেশের অবস্থানে মিল বাড়ছে। ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছে মস্কো ও বেইজিং দুপক্ষই। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। কারণ চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চীনের অর্থনীতিতে।
এখানেই রাশিয়া নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে মস্কো এখন আরও বেশি করে চীনের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় বেইজিংও রাশিয়ার জ্বালানি, কাঁচামাল ও কৌশলগত সহযোগিতা ব্যবহার করছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও সামরিক স্তরেও গভীর হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামরিক সহযোগিতা।
গত এক দশকে যৌথ সামরিক মহড়া, নৌ টহল, আকাশ প্রতিরক্ষা অনুশীলন এসব কিছুর মাত্রা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। দক্ষিণ চীন সাগর, জাপান সাগর থেকে শুরু করে আর্কটিক অঞ্চল পর্যন্ত দুই দেশের সমন্বিত সামরিক উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে।
আপাতত একটি বিষয়ে তারা একমত। পশ্চিমা প্রভাব কমাতে হলে একে অন্যকে প্রয়োজন। আর সেই কারণেই আজকের বিশ্বে রাশিয়া-চীনের সম্পর্ক কেবল সাধারণ কূটনৈতিক বন্ধুত্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে নতুন এক বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা।
যার প্রভাব ইউক্রেন থেকে তাইওয়ান, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আর্কটিক সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব রাজনীতির আগামী অধ্যায় হয়তো ঠিক এখান থেকেই লেখা শুরু হচ্ছে।
/কেএইচও