রামিসাকে ধর্ষণ! রাষ্ট্রের টলারেন্স

মোছা. নূরজাহান খাতুন

মতামত

জনৈক আমেরিকান লেখক জন পার্কিন্স বলেছিলেন একটি দেশ কতটুকু সভ্য সেটা বোঝা যায় ‘সে দেশ বা দেশের জনগণ নারী এবং

2026-05-22T06:14:45+00:00
2026-05-22T06:14:45+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
রামিসাকে ধর্ষণ! রাষ্ট্রের টলারেন্স
মোছা. নূরজাহান খাতুন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬, ৬:১৪ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
জনৈক আমেরিকান লেখক জন পার্কিন্স বলেছিলেন একটি দেশ কতটুকু সভ্য সেটা বোঝা যায় ‘সে দেশ বা দেশের জনগণ নারী এবং শিশুদের প্রতি কী আচরণ করে’। জন পার্কিন্সের মত অনুসারে বাংলাদেশ বা এ দেশের মানুষ কি সভ্য? আমরা কবে সভ্য হব? আমাদের মনুষত্ব না থাকলে, সভ্য না হলে এত রাজনীতি, অর্থনীতি ধর্ম, উন্নয়ন দিয়ে কী হবে?

নারীর ওপর যৌন নির্যাতনই নারী নির্যাতনের সর্বোচ্চ রূপ নয়। তবে যৌন নির্যাতন বিশেষত ধর্ষণই হলো নারী নির্যাতনের সর্বোচ্চ রূপ। সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই নারী নির্যাতন হতে পারে বা তা ব্যাপকতা লাভ করতে পারে একমাত্র সেখানেই যেখানে সাধারণভাবে নারী নির্যাতনের মাত্রা বেশি ও ব্যাপক।

এ জন্য শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনকে সাধারণভাবে সমাজে বিরাজমান নারী নির্যাতন এবং নারীর অধিকারহীনতা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা চলে না। গত ১৯ মে  পল্লবীতে রামিসার ধর্ষিত হওয়া এবং এরপর মৃত্যুই প্রমাণ করে নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার, বেড়ে উঠার অধিকার এ দেশে নেই!

রামিসাকে, পুতুলকে, আছিয়াকে ধর্ষণ করা মানে কি রাষ্ট্রকে ধর্ষণ নয়? কারণ রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় চারটি উপাদান- একটা নির্দিষ্ট সীমানা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, রাষ্ট্রের জনগণ এবং সার্বভৌমত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রের এই চারটি উপাদানের অন্যতম উপাদান হচ্ছে মানুষ। আর এই হীন, জঘন্য মানুষগুলো তো অন্য গ্রহের নয়, এ দেশেরই মানুষ, এ দেশই তাদের সাহস দেয় এই হীন কাজগুলো করতে। 

রাষ্ট্রের সেই মানুষই যখন ছেলে মেয়েভেদে পার্থক্য হয়, তাদের চলাফেরায় পার্থক্য করতে হয়, পোশাকে মার্ক করা হয়, মেয়েদের সাজগোজকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়, মেয়েদের ধারণা বা শিখাতে হবে যে ছেলেরা হায়েনার মতো, তুমি কোনো ছেলে মানুষের কাছে নিরাপদ নও তা সে যে বয়সেরই হোক না কেন, এই জঘন্য মানুষই যখন রাষ্ট্রের গুরত্বপূর্ণ উপাদান রামিসাদের ধর্ষণ তা হলে সেই রাষ্ট্রের কি মর্যাদা থাকতে পারে? 

অনেকেই নারী-শিশু নির্যাতন রোধে বা বন্ধে বহু সাজেশন করেন যেমন- মেয়েদের বোরকা পরতে হবে তা হলে ছেলেরা নিজেদের সংবরণ করতে পারবে, মেয়েদের ভালো স্পর্শ খারাপ স্পর্শ বোঝাতে হবে, বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল করতে হবে ইত্যাদি।

প্রশ্ন হলো রামিসা, পুতুল, আছিয়াকে এগুলো শেখানো হলেই বা যদি হয়েও থাকে তা হলেও কি তাদের এই হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা করার কোনো উপায় ছিল? বাংলাদেশ এখনও কেন নারীর মর্যাদা দিতে পারে না, এখনও কেন নারী নির্যাতনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম স্থানে (ফিজি, কিরিবাতি, পাপুয়া নিউগিনি, ভানুয়াতু এরপর) থাকে?

বাংলাদেশে নারীর অবস্থান বিভিন্ন জাতীয়, আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী দেখলে দেখা যায় যে, নারী নির্যাতনের দিক থেকে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ তথ্যমতে, নারীদের প্রতি সহিংসতার হারে বাংলাদেশ বৈশ্বিক শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। 

এ ছাড়া নারীর প্রতি সামগ্রিক সহিংসতার (Intimate Partner Violence) বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা 
তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে নারী নির্যাতনের হার : 

১। আজীবন নির্যাতনের হার : বাংলাদেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ (প্রতি চারজনে তিনজন) নারী তাদের জীবদ্দশায় কোনো না কোনো সময় সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন।

২। সঙ্গী দ্বারা নির্যাতন : দেশের ৫০ থেকে ৫৪ শতাংশ বিবাহিত নারী তাদের স্বামীর দ্বারা অন্তত একবার শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন, যা বিশ্ব গড়ের (৩০ শতাংশ) চেয়ে অনেক বেশি।

৩। বাল্যবিয়ে : বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে বাল্যবিয়ে। বাংলাদেশে বালবিয়ের ব্যাপকতা বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ। করোনা মহামারি মেয়েদের বাল্যবিয়ের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিয়েছিল সে কথা আমাদের সবারই জানা। করোনাকালে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিবেদনে আলাদাভাবে করোনা মহামারির মধ্যে সর্বশেষ ১২ মাসে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারীর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। সে তালিকায়ও ১৬তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।  

এ ছাড়া যৌতুক, বিয়ে, সামাজিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ ইত্যাদি বহুবিধ কারণে আমাদের দেশের নারীরা নির্যাতিত হয়।

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো এসব নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনক হলেও, শতকরা ৫১ ভাগের বেশি নারী জানেন না নির্যাতনের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ বা সহায়তা চাইতে হবে। মাত্র ৬ শতাংশ নারী নির্যাতনের বিষয়ে অভিযোগ করে থাকেন। সম্মানের কথা ভেবে বেশিরভাগই চুপ থাকেন। 

তাই নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে বলেই ধারণা করা হয়। বিশ্বের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে জেন্ডার সমতা ও নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে পেছনের সারিতে রয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন আইন ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ থাকলেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সচেতনতার অভাবে পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি ঘটছে না।

নারী নির্যাতন বন্ধে করণীয় : বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, আইনি সহায়তা প্রদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমে পরিবার থেকেই পরিবর্তন আনতে হবে।

সামাজিক-পারিবারিক সমতা, সম-অধিকার নিশ্চিত করতে পারলে তবেই নারীর ক্ষমতায়ন হবে এবং সহিংসতা কমবে। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও আইনি পর্যায়ে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে-

১. আইনি সচেতনতা ও পদক্ষেপ : নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এবং পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা প্রয়োজন। বাল্যবিয়ে ও যৌতুকের মতো কুপ্রথাগুলোর বিরুদ্ধে পাড়া-মহল্লা ও কর্মক্ষেত্রে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে।

নির্যাতনের শিকার হলে বা নির্যাতনের আশঙ্কা থাকলে চুপ না থেকে নিজের সুরক্ষার জন্য নিকটস্থ থানা, মানবাধিকার সংগঠন বা সরকারি সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে।

যেকোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক বা যৌন হয়রানির শিকার হলে বা আশঙ্কা থাকলে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও তাৎক্ষণিক আশ্রয়ের জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল টোলফ্রি হেল্পলাইন ১০৯-এ যোগাযোগ করা যায় সেটি বিভিন্ন মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। নির্যাতিতার পক্ষে বিনামূল্যে আইনি লড়াই ও পুনর্বাসন সহায়তা মানুষের হাতের নাগালে রাখতে হবে। 

২. পারিবারিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ : পারিবারিকভাবে মেয়েদের ভ্যালু দিতে হবে যাতে করে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নারীদেরকে মানুষ ভাবতে শেখে।

৩। আত্মবিশ্বাসী হওয়া : নিজের অধিকার সম্পর্কে মেয়েদের সচেতন হতে হবে এবং যেকোনো ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মানসিকতা থাকতে হবে।

৪। খোলাখুলি আলোচনা : পরিবারে ছেলেমেয়ের মধ্যে কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে। পারিবারিক বিরোধগুলো সহিংস উপায়ে না মিটিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।

৫। সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ : নারী নির্যাতনকে শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা না ভেবে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলুন।

৬। সর্বোপরি নারী-শিশুর নির্যাতন বন্ধ করতে ব্লেম গেম খেলার কোনো সুযোগ থাকা ঠিক হবে না। রাষ্ট্রযন্ত্রে অবরুদ্ধ শিক্ষার বদলে উদারনৈতিক শিক্ষা যেখানে যুক্তি, বিতর্ক কাজ করবে তেমন শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে জাতিকে। 

আর বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে এবং ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে কালক্ষেপণ না করে দ্রততম সময়ে বিচার করতে হবে।

বিচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের মেসেজ হবে যে এ রাষ্ট্র নারী নির্যাতন দেখতে চায় না, তা হলেই সোহেলদের মতো হায়েনারা ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য, পশুত্ব কাজ করতে অবশ্যই ভয় পাবে। নারী নির্যাতন বন্ধে রাষ্ট্রের মেসেজই সবচেয়ে বড় এবং কার্যকরী মেসেজ!

লেখক : সাবেক অতিরিক্ত সচিব


  বিষয়:   রামিসা  ধর্ষণ  টলারেন্স 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: