বিপদের দিনে পাশে না থাকার অভিযোগ জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে!

সুদীপ্ত শামীম, সুন্দরগঞ্জ

সারাদেশ

আমার চাচিকে যখন কুকুর কামড় দিয়েছিলো তখন আশপাশ গ্রামের মানুষকে কাছে পাইনি। চেয়ারম্যানকে পাইনি। এমপিকেও কাছে পাইনি। আর যখন চাচি

2026-05-23T10:42:07+00:00
2026-05-23T10:42:07+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
কুকুরের কামড়ে ৫ জনের মৃত্যু
বিপদের দিনে পাশে না থাকার অভিযোগ জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে!
সুদীপ্ত শামীম, সুন্দরগঞ্জ
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ১০:৪২ এএম 
কুকুরের কামড়ে নিহত ৫ জন। ছবি : সংগৃহীত
আমার চাচিকে যখন কুকুর কামড় দিয়েছিলো তখন আশপাশ গ্রামের মানুষকে কাছে পাইনি। চেয়ারম্যানকে পাইনি। এমপিকেও কাছে পাইনি। আর যখন চাচি মারা যায় তখন এমপি আইসছে, চেয়ারম্যান আইসছে, ইউএনও আইসছে। আসি ট্যাকা দিয়া যায়। আমরাতো ট্যাকা চাইনা, চাচিকে চাই। আইজকা চাচি বাঁচি থাইকলে হামার কতো উপকার হতো। কথাগুলো বলতে বলতে চোখের জল আর ধরে রাখতে পারেননি কুকুরের কামড়ে নিহত বিধবা মোছা. সুলতানা বেগমের ভাতিজা মো. হিরু মিয়া (২৬)।

এই কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গোটা ঘটনার নির্মম সত্য। একটি বেওয়ারিস কুকুরের কামড় থেকে শুরু। তারপর চিকিৎসার জন্য দ্বারে দ্বারে যাওয়া। সরকারি হাসপাতালে হয়রানি। ভ্যাকসিনের অভাব। পাশে না থাকা মানুষজন। আর শেষে একে একে পাঁচটি মৃত্যু। মৃত্যুর পরে হুড়মুড় করে সবার আগমন। টাকার থলে নিয়ে।

শুধু হিরু মিয়া নন। জলাতঙ্কে পাঁচজনকে হারানো পরিবারগুলোর বুকভাঙা কষ্টের গল্প প্রায় একই। সবার অভিযোগের সুর গিয়ে মেলে এক জায়গায়, বিপদের দিনে কেউ পাশে ছিলেন না। আর যখন লাশ ঘরে, তখন ভিড় করলেন সবাই। এই অবহেলা ও ব্যর্থতার প্রশ্ন এখন গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। ঘটনায় হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট দায়ের হয়েছে।

গেল এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নে নেমে আসে সেই বিভীষিকা। একটি বেওয়ারিস কুকুর হামলা চালিয়ে একইদিনে শিশু ও নারী-পুরুষসহ ২২ জনকে কামড়ে জখম করে। হঠাৎ এই আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েন আহতরা এবং তাদের পরিবার। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো বুঝতে পারছিলেন না, এখন কী করবেন, কোথায় যাবেন, কার কাছে সাহায্য চাইবেন। সঙ্গে ছিল চিকিৎসার খরচ জোগানোর দুশ্চিন্তা।


অভিযোগ রয়েছে, সেই দুর্বিপাকে পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাননি তারা। না প্রতিবেশী, না জনপ্রতিনিধি, না প্রশাসন। কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিলেও জলাতঙ্ক প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন নেওয়ার বিষয়ে ছিল অবহেলা। প্রথম ধাক্কাটা সামলে নেওয়ার পর অনেকে ভেবে নিয়েছিলেন বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু জলাতঙ্কের ভাইরাস নীরবে শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন পাঁচজন। নন্দ রানী, মোছা. সুলতানা বেগম, মো. ফুল মিয়া, মোছা. আফরোজা বেগম ও রতনেশ্বর কুমার। কেউ গৃহিণী, কেউ কৃষক, কেউ বিধবা। সবার ঘরেই এখন শূন্যতা। বাকি আহতরা এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন, বেঁচে ফেরার লড়াই করছেন।

সরকারি হাসপাতালে গিয়েও স্বস্তি মেলেনি, বরং যোগ হয়েছে নতুন যন্ত্রণা। গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে আহতদের। হাসপাতালে ইনজেকশন নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে চড়া দামে কিনতে হয়েছে ইনজেকশন, সুতা, তুলা, গ্লাভস। এমনকি সরকারি ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করার জন্যও নিয়েছেন টাকা।

নিহত মো. ফুল মিয়ার বড় ভাই মো. ইউনুস আলী (৫৬) সেই দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে গলা ভারী হয়ে আসে তার। বলেন, এখন সবাই আইসে আর টাকা দেয়। আর সেই দিন টাকা ছাড়া হামার কথা কেউ শোনে নাই। সরকারি হাসপাতালে গেছি, ওমরা কয় ইনজেকশন নাই। পরে বাহির থাকি বেশি দামে ইনজেকশন কিনি। সুতা কিনি। তুলা কিনি। গ্লাভস কিনি। ইনজেকশন ফোঁড়ার টাকাও নিছেন সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। তানা হলে ইনজেকশনও ফোঁড়ে না। এখন ভাই মারা যাওয়ার পর ওমার টাকা আর সহযোগিতা দিয়া হামরা কি করি।

আরেক নিহতের স্বজন মোছা. সাবিহা আক্তার (৪৫) কান্না চেপে রাখতে পারেন না। ক্ষোভে ও কষ্টে বলেন, যখন আমার জাকে কুকুর কামড়াইছে তখন আমরা খুব ভয় আর আতঙ্কে ছিলাম। তখন কোনো লোক আমাদের খোঁজ করে নাই। টাকা ছাড়া কোনো ভ্যাকসিন দেয় নাই। আর এখন আমার জা মারা গেইছে, তখন মেম্বার আইসে, চৌকিদার আইসে, ইউএনও আইসে, এমপি আইসে। এই আসাটা যদি তখন আইলো হয় তাহলে হয়তো আমার জা আজকে মারা যাই তো না। এখন হামরা ওমার টাকা কি করি? তখন তো টাকা ছাড়া সরকারি ডাক্তারও ইনজেকশন ফোঁড়ে নাই।

মৃত্যুর মিছিল শুরু হতেই দৃশ্যপট বদলে গেল। প্রশাসন নড়েচড়ে বসল। এলাকায় কুকুরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হলো। সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু হলো। আহতদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু হলো। ঘরে ঘরে পৌঁছাতে লাগলো আর্থিক সহায়তা। স্থানীয়দের মনে তখন একটাই প্রশ্ন, যখন মানুষগুলো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল, চিকিৎসার টাকা নেই, ভ্যাকসিন নেই, পাশে কেউ নেই, তখন কোথায় ছিল এই সহানুভূতি? এই তৎপরতা?

এ বিষয়ে কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকার বলেন, কুকুর কামড়ানোর দশ মিনিটের মধ্যে সংবাদ পাই। তাৎক্ষণিকভাবে মেম্বার এবং চৌকিদারকে বলে পাঠাই দ্রুত যেনো তাদেরকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। পরে তারা সবাই গাইবান্ধা হাসপাতালে গিয়েছিলো এবং ভ্যাকসিন নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এরপর হয়ত তারা নিশ্চিতভাবে ভেবে নিয়েছিলেন যে আর কোনো সমস্যা হবে না। তারাও জানতো না যে তাদের এতোবড় মারাত্মক ক্ষতি হবে।

চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যের সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ মেলে না। পরিবারগুলো বলছে, তারা চিকিৎসা নিতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিন ছিল না। টাকা ছাড়া ইনজেকশন দেওয়া হয়নি। সেই দুর্দিনে কেউ পাশে থাকলে হয়ত এই পাঁচটি মৃত্যু এড়ানো যেত।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি অকপটে স্বীকার করেন, আহত হওয়ার পরে যাইনি। মারা যাওয়ার পরে গিয়েছিলাম। তবে এখন পর্যন্ত খোঁজখবর রাখছি।

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও গাইবান্ধা জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মো. মাজেদুর রহমান বলেন, কুকুর কামড়ানোর বিষয়টি আমাকে মেম্বার, চেয়ারম্যান বা অন্য কেউ জানাননি। সে কারণে মারা যাওয়ার আগে যেতে পারিনি। তবে মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। স্বাস্থ্য ও ত্রাণ মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ভ্যাকসিনসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাৎক্ষণিক সিভিল সার্জন ও টিএইচওকে ফোন করেছিলেন। সার্বিক বিষয়ে আমি এখনো যোগাযোগ রাখছি।

গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকাও শুরুতে আরও জোরালো হওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আপনারাও যদি শুরুতে কুকুরের কামড়ে আহতদের বিষয়টি বেশি করে প্রকাশ করতেন, তাহলে হয়ত এত বড় ক্ষতি হতো না।

গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসিফের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

ঘটনার গুরুত্ব এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বুধবার (২০ মে) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাফিনুর ইসলাম হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন। রিটে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং সারাদেশে পর্যাপ্ত অ্যান্টি-রেবিস টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়েছে। রিটে অ্যান্টি-রেবিস টিকার সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও আনা হয়েছে।

রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গাইবান্ধা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি ইকবাল কবির ও এসএম সাইফুল ইসলামের দ্বৈত বেঞ্চ গাইবান্ধা সিভিল সার্জনকে ঘটনার তদন্ত করার নির্দেশ দেন। আগামী ৮ জুনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো গাফিলতি ছিলো কি না তা খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোলের ছয় সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল। কুকুরের কামড়ে আহত বাকিরা এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের শঙ্কা কাটেনি। পরিবারগুলো প্রহর গুনছে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি একটাই, মৃত্যুর পরে সমবেদনা নয়, বিপদের দিনে চাই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস। হিরু মিয়া চোখ মুছতে মুছতে বলেন, এ ধরনের বিপদ হলে আমরা সবাই যেন ক্ষতিগ্রস্ত সেই পরিবারের পাশে দাঁড়াই।

সময়ের আলো/জোই




  বিষয়:   কুকুরের কামড়  মৃত্যু  বিপদের দিন  জনপ্রতিনিধি  প্রশাসন 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: