গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটিকাপাসিয়া খেয়াঘাট জোরপূর্বক দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে। এ সময় বৈধ ইজারাদারের এক মাঝিকে পিটিয়ে পা ভেঙে দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ থানায় লিখিত এজাহার দিয়েছেন ভুক্তভোগী ইজারাদার ও কাপাসিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. হারুন-অর-রশিদ।
অভিযুক্ত জামাল উদ্দিন কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটিকাপাসিয়া গ্রামের মো. ওসমান গনীর ছেলে।
এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২২ মে) সকালে সমর্থকদের নিয়ে ভাটিকাপাসিয়া খেয়াঘাটে হাজির হন জামাল উদ্দিন। এরপর জোরপূর্বক ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজের লোকজন দিয়ে পারাপার কার্যক্রম শুরু করলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এজহারে উল্লেখ করা হয়, ঘাট দখলের আগে থেকেই জামাল উদ্দিন ইজারাদার হারুন-অর-রশিদের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন এবং চাঁদা না দিলে ঘাট দখলের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে লাঠি, ছোরা ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত একদল লোক ঘাটে প্রবেশ করে। তারা ইজারাদারের নৌকায় কর্মরত মাঝি মো. কবির উদ্দিনকে টেনে নামিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে। অভিযোগ রয়েছে, জামাল উদ্দিন নিজে লোহার রড দিয়ে কবির উদ্দিনের ডান পায়ের হাঁটুর নিচে আঘাত করলে তার পা ভেঙে যায়। পরে স্থানীয়রা আহত মাঝিকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
হামলার পরও অভিযুক্তরা ঘাট ছেড়ে না গিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা না পাওয়া পর্যন্ত ঘাট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ঘোষণা দেন এবং ইজারাদারের লোকজনকে প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া-ভাটিকাপাসিয়াসহ ৩ নম্বর প্যাকেজের আওতাধীন খেয়াঘাটগুলো ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ইজারা দেওয়া হয়েছে। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে লালচামার গ্রামের মো. হারুন-অর-রশিদ ইজারা লাভ করেন এবং জেলা পরিষদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘাট পরিচালনা করে আসছিলেন।
স্থানীয়রা জানান, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগেও জামাল উদ্দিন এই ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। পরে ১৪৩২ বঙ্গাব্দের খাস কালেকশনেও তিনি অংশীদার ছিলেন। তখন স্থানীয়দের সম্মতিতে যাত্রীপ্রতি টোল ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও ৩০ টাকা হারে টোল আদায় করা হচ্ছিল।
তবে সম্প্রতি অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ তুলে জামাল উদ্দিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ও ঘাট এলাকায় মানববন্ধন করেন। এ নিয়ে স্থানীয়দের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, আগে যে হারে তিনি নিজেও টোল আদায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, একই হারে অন্য কেউ টোল আদায় করলে এখন এই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি কোথায়।
অভিযুক্ত বিএনপি নেতা মো. জামাল উদ্দিন মারধর ও চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কারও কাছে চাঁদা চাইনি। তবে স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খেয়াঘাটটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৩০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করে টোল আদায় করা হচ্ছে, এতে সাধারণ মানুষ খুশি। আমি আগে ৩০ টাকা তোলায় যুক্ত থাকলেও সবসময় টোল কমানোর পক্ষেই ছিলাম।
ভুক্তভোগী ইজারাদার মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, বৈধ প্রক্রিয়ায় জেলা পরিষদ থেকে ঘাট ইজারা নিয়েছি। ১৪৩২ বঙ্গাব্দে খাস কালেকশনের সময় জামাল উদ্দিন নিজেও ৩০ টাকা টোল নির্ধারণের সিদ্ধান্তেই ছিলেন। অথচ এখন জোরপূর্বক ঘাট দখল করে আমার মাঝিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. বাবুল আহমেদ বলেন, হাট-বাজার ও খেয়াঘাট সরকারি সম্পত্তি, যা নিয়ম অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জোরপূর্বক দখল নেওয়ার এখতিয়ার নেই। জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে খেয়াঘাট দখলের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাইবান্ধা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বিপুল চন্দ্র দাস বলেন, বৈধ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে হারুন-অর-রশিদ ইজারা পেয়েছেন। তাই ওই ঘাট অন্য কারও দখল করার কোনো সুযোগ নেই। জেলা পরিষদের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি খেয়াঘাট পরিচালনা করতে পারবেন না। ১০ টাকায় পারাপার কেন, ইজারাদার ছাড়া অন্য কেউ বিনামূল্যে পারাপার করালেও সেটি নিয়মবহির্ভূত হবে।
সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, এ বিষয়ে শুক্রবার রাতে একটি লিখিত এজাহার পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গাইবান্ধা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সময়ের আলো/জোই