গত কয়েক মাস ধরে ঢাকার বিভিন্ন সেমিনার ও আলোচনায় একটি কথাই ঘুরে-ফিরে এসেছে- শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। অবশ্য এ দাবি নতুন নয়। প্রতি বছর বাজেটের আগে একই আলোচনা হয়, দাবি তোলা হয়, স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়।
এরপর বাজেট ঘোষণা আসে, অঙ্কের হিসাবে কিছু বৃদ্ধি দেখা যায়, কিন্তু জিডিপির তুলনায় বরাদ্দের হার আবারও কমে যায়। বছরের পর বছর ধরে এই একই দৃশ্য দেখতে দেখতে এখন আর এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকে না। আমি গত বছর একটি প্রাক-বাজেট আলোচনায় উপস্থিত ছিলাম। সেখানে শিক্ষাবিদদের পক্ষ থেকে জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছিল।
অন্যদিকে সরকারের প্রতিনিধিরা বলছিলেন, শিক্ষা এখনও তাদের অগ্রাধিকারের অন্যতম ক্ষেত্র। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। শিক্ষায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে জিডিপির মাত্র ১.৭২ শতাংশ, যা দশ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। গত দশ বছর ধরে এ হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে শিক্ষায় ব্যয় ছিল জিডিপির ২.৪৯ শতাংশ, বর্তমানে তা নেমে এসে দেড় শতাংশের সামান্য ওপরে ঠেকেছে। প্রায় প্রতি বছর প্রাক-বাজেট এবং মূল বাজেটের বিশ্লেষণ করলে শিক্ষা খাতে এই দীনতা ধরা পড়ে।
রাজশাহীর একটি সরকারি স্কুলে গিয়েছিলাম কয়েক দিন আগে। শ্রেণিকক্ষে ৬০ জন শিক্ষার্থী, একজন শিক্ষক, হাতে পুরোনো চক। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কথা কাগজে আছে, বাস্তবে সেই ঘরে তালা ঝুলছে। সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে, মেরামতের বরাদ্দ নেই। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারা দেশের চিত্র মোটামুটি এ রকমই।
সাম্প্রতিক একটি তথ্য এখানে বলা দরকার। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার এখনও প্রায় ১৪ শতাংশের ওপরে। মাধ্যমিক স্তরে এই হার আরও বেশি, বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে গ্রামীণ এলাকায় এটি কোথাও কোথাও ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই শিশুরা স্কুল ছেড়ে চলে যাচ্ছে কারণ পরিবারের আর্থিক চাপ সামলানোর জন্য উপবৃত্তি যথেষ্ট নয়, শিক্ষার মান আকর্ষণীয় নয় এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম পরিবেশ নেই। শুধু টাকা না ঢেলে এই বাস্তবতার দিকে তাকানো দরকার।
তা হলে কি শুধু টাকা বাড়ালেই সমস্যা মিটবে? না, এটি ততটা সরল নয়। প্রতি বছরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের একটা অংশ অব্যয়িত থেকে যায়। অর্থবছরের শেষ তিন মাসে হুড়মুড় করে টাকা খরচ করা হয়, পরিকল্পনা ছাড়া। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রায় অর্ধেক শিক্ষা বাজেট এই সময়েই বেরিয়ে যায়। ফলে ভালো অবকাঠামো হয়, কিন্তু তার ভেতরে মানসম্মত শিক্ষা আসে না।
তারপরও বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। কারণ এখন যা আছে সেটি দিয়ে খরচ সামলানোই কঠিন। ইউনেস্কো জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করার পরামর্শ দেয়। আমাদের প্রতিবেশী ভুটান জিডিপির প্রায় ছয় শতাংশ দেয়। নেপাল দেয় প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ। ভারত সম্প্রতি তার জাতীয় শিক্ষা নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। আমরা দেড়ের কোটায় আটকে আছি।
এখানে একটা বড় প্রশ্ন আছে। টাকা বাড়লে সেটি কার কাছে পৌঁছাবে? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী পড়েন, অথচ মাথাপিছু বার্ষিক সরকারি ব্যয় মাত্র ৭০০ টাকার মতো। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী প্রতি ব্যয় বহুগুণ বেশি। বিদ্যমান বণ্টন কাঠামো যদি না বদলায়, তা হলে বাজেট বাড়লে সুফল এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে না।
যে সরকার আগামী বাজেট তৈরি করছে, তাদের কাছে কয়েকটি পথ খোলা আছে। সরাসরি না বলেও বোঝা যায় কোন পথে হাঁটলে ফল মিলবে। যেমন উপবৃত্তি কার্যক্রমের আওতা বাড়ানো গেলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে বাধ্য। এটি কোনো নতুন কর্মসূচি তৈরির দরকার নেই, বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই পরিমাণ বাড়ালে কাজ হয়। তেমনি কারিগরি শিক্ষার জন্য আলাদা তহবিল রাখলে শ্রমবাজারে দক্ষ মানুষের চাহিদা মেটানো সহজ হয়।
এই মুহূর্তে দেশে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত, যেখানে মালয়েশিয়ায় এই হার ইতিমধ্যে ৫৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এই ব্যবধানটা আকস্মিক নয়, এটি নীতি ও বরাদ্দের প্রত্যক্ষ ফল।
শিক্ষকদের অবস্থান। সিলেবাস বদলায়, পাঠ্যক্রম নতুন হয়, কিন্তু যিনি পড়াবেন তার বেতন আর সুযোগ যদি না বাড়ে, তা হলে পরিবর্তন শুধু কাগজেই থাকবে। মেধাবীরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয় না, কারণ এটি আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের গড় বেতন এখনও পাঁচ থেকে আট হাজার টাকার মধ্যে আটকে আছে অনেক প্রতিষ্ঠানে।
এই বাস্তবতায় পেশাদার মানের শিক্ষকতা আশা করা কঠিন। এমপিও কাঠামোর আওতা বিস্তৃত করা এবং সে সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো একটি কার্যকর পথ হতে পারে, যদি ইচ্ছাটা থাকে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এশিয়ার র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ তিনশর মধ্যে নেই। কারণ গবেষণায় বরাদ্দ নেই বললেই চলে। করোনার সময় পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সমাধান খুঁজছিল, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেনি।
যন্ত্রপাতি নেই, তহবিল নেই, প্রণোদনা নেই। গবেষণা থাকলে জ্ঞান তৈরি হয়, জ্ঞান থাকলে দেশ এগোয়। এই বাস্তবতায় সরকার যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি পৃথক গবেষণা তহবিল চালু করে এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে
গবেষণা অংশীদারত্বের কাঠামো তৈরি করে, তা হলে কাজটা সহজ হয়।
২০২৫-২৬ বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ ছিল ৪৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা এবং প্রাথমিকে ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। মোট শিক্ষা বরাদ্দ ছিল ৯৫ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র ১.৭২ শতাংশ। আসন্ন ২০২৬-২৭ বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়বে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এটি ইতিবাচক। কিন্তু জিডিপির অনুপাতে এটি কোথায় দাঁড়াবে, সেটিই আসল পরীক্ষা।
সম্প্রতি একটি খবর এই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সরকারি স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় কোমলমতি শিশুদের পচা ডিম আর বাসি পাউরুটি খাওয়ানো হয়েছে। টেলিভিশনের পর্দায় যখন দেখা গেল অসুস্থ বাচ্চাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আসে। বরাদ্দ ছিল, কর্মসূচি ছিল, কাগজে সব ঠিকঠাক ছিল। তারপরও কীভাবে শিশুদের মুখে এই খাবার গেল? উত্তর একটাইÑ মাঠ পর্যায়ে কোনো কার্যকর তদারকি নেই।
একটা কথা পরিষ্কার বলা দরকার। বরাদ্দ বাড়লেই হবে না। সেই টাকা কীভাবে খরচ হচ্ছে, কার কাছে পৌঁছাচ্ছে, কোথায় অপচয় হচ্ছে, সেটি নিরীক্ষার জন্য শক্তিশালী ব্যবস্থা দরকার। জবাবদিহি ছাড়া বরাদ্দ বৃদ্ধি অনেক সময় দুর্নীতির পথ খুলে দেয়।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের যে অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে উঠছে, সেটি এই আশঙ্কার ভিত্তি দেয়। তাই বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা ব্যয়ের তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা একটি জরুরি পদক্ষেপ হতে পারে।
একটি পরিসংখ্যানের কথা মনে করিয়ে দিই। বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সে বাংলাদেশের স্কোর ০.৪৬, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ০.৪৮ এবং পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গড় ০.৫৯। এই সংখ্যার অর্থ হলো আজকের একটি শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার সম্ভাব্য উৎপাদনশীলতার মাত্র ৪৬ শতাংশ অর্জন করবে, যদি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বর্তমান মান অপরিবর্তিত থাকে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আগামীর অর্থনীতির একটি সতর্কবার্তা।
আগামী প্রজন্মের জন্য এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ আর নেই। শিক্ষায় বিনিয়োগ যত পিছিয়ে দেওয়া হবে, তার মূল্য একসময় পুরো অর্থনীতিকেই চুকাতে হবে। দক্ষ জনশক্তি ছাড়া শিল্প-কারখানা সচল থাকে না, নতুন উদ্ভাবনের জন্ম হয় না, রফতানির সক্ষমতাও বাড়ে না। তাই বিষয়টি কেবল নীতিনির্ধারণের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ টিকে থাকা ও প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার প্রশ্ন।
ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
সময়ের আলো/জেডি