'২০২০ সালে নোটিশ দেওয়ার পর থেকেই আমরা যেন অদৃশ্য কারাগারে বন্দি। ঘর মেরামত করতে পারি না, নতুন কিছু করতে পারি না, ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মিলছে না। এখন মনে হচ্ছে রাষ্ট্রই আমাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে।' ক্ষোভ আর আক্ষেপ ভরা কথাগুলো বলছিলেন সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের রঙ্গিটিলা গ্রামের বাসিন্দা মো. বুলবুল মিয়া। সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিরাপত্তা বেষ্টনী ও নিরাপত্তা টহল সড়ক নির্মান প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ ঘোষিত এলাকার একজন ভুক্তভোগী তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, বিমানবন্দরের এ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও দীর্ঘ ৬ বছরেও ক্ষতিপূরণের অর্থ পাননি শত শত পরিবার। কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ১১ বার প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করার কারণে সৃষ্ট এই দীর্ঘসূত্রিতায় একদিকে যেমন স্থানীয়রা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে নাগরিক ও মৌলিক সেবা থেকেও বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের ধোপাগুল, ছালিয়া, আটকিয়ারী, লালবাগ, বাইশটিলাসহ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ১৫৩ একর ভূমি বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য অধিগ্রহণের আওতায় আনা হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ৪ ধারা নোটিশ জারি ও যৌথ তদন্ত শেষ হলেও আজ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাননি ভূমির মালিকরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, 'স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন ২০১৭' অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিষয়টি বছরের পর বছর ঝুলে আছে।
বুলবুল মিয়া বলেন, ‘অধিগ্রহণ ঘোষিত এলাকার প্রায় সাড়ে ৩শ পরিবার এখন নাগরিক সনদ, উত্তরাধিকার সনদ পর্যন্ত পাচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও অনেক সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। এলাকায় কোনো উন্নয়ন কাজও হচ্ছে না।’
মংলিরপার গ্রামের জহির আহমদ বলেন, ‘২০২০ সালের ৪ ধারার নোটিশের পর থেকে বাড়িঘর সংস্কার, সম্প্রসারণ কিংবা নতুন উন্নয়ন কাজ বন্ধ। আমরা বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। ৪৫ দিনের মধ্যে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ না দিলে এলাকাবাসী আন্দোলনে নামব।’
লালবাগ গ্রামের শায়েস্তা মিয়া বলেন, ‘২০২৪ সালের ভয়াবহ শিলাবৃষ্টির পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙে গেলেও অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে তারা বাড়িঘর সংস্কার করতে পারেননি। ফলে অনেক পরিবার এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে।’
বিমানবন্দর অধিগ্রহণ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক আবদুল হালিম বলেন, ‘২০২০ সালের পর আর কোনো কাগজ দেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসক কার্যালয়সহ বিভিন্ন দফতরে বহুবার গিয়েছি, কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কিছু পাইনি। এখন যদি ২০২০ সালের দরে ক্ষতিপূরণ দেয়, তাহলে মানুষ নতুন করে জমি কিনে পুনর্বাসিত হতে পারবে না। গত ছয় বছরে জমির দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। রাষ্ট্র যদি ক্ষতিগ্রস্তদের বিপক্ষে যায়, সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও স্বীকার করছেন এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। খাদিমপাড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। তিনটি সরকার পরিবর্তন হলেও এখনও কোনো অগ্রগতি হয়নি। অধিগ্রহণের কারণে ইউনিয়ন পরিষদও ওই এলাকা থেকে কর আদায় করতে পারছে না। আবার উন্নয়ন কাজও আটকে আছে।’
খাদিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘অধিগ্রহণের চিঠি প্রায় ছয় বছর আগে দেওয়া হয়। এরপর থেকে এলাকাবাসী দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় আছেন। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ না দিলে ভূমি মালিকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমদ বলেন, ‘অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে একাধিক জায়গায় বিভিন্ন সময়ে সংশোধন করা হয়েছে। কিছু অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ পড়েছে। প্রয়োজনীয় বিষয় সংযুক্ত হয়েছে। মাঝখানে ভূমি অধিগ্রহণ বন্ধ থাকলেও বিশেষ অনুমোদন আনা হয়েছে পরবর্তী সময়ে। এ কারণে অধিগ্রহণ চূড়ান্ত করতে সময় লাগছে। বিষয়টি নিয়ে সিভিল অ্যাভিয়েশনের প্রশাসন শাখা ও সিলেটের জেলা প্রশাসন কাজ করছে।’
সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সারওয়ার আলম অধিগ্রহণ চূড়ান্ত করতে দেরি হওয়া এবং জন ভোগান্তির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ রেকর্ড ১১ বার অধিগ্রহণের এ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন করেছে। এ কারণেই দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়েছে। আমরা দ্রুত বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি।’
তবে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন- যদি প্রকল্পের নকশাই বারবার বদলায়, তাহলে কেন ছয় বছর ধরে সাধারণ মানুষকে এভাবে অনিশ্চয়তায় রেখে দেওয়া হলো? এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটাই দাবি, দ্রুত অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় রাজপথে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
/মহু