সাইরেন বাজিয়ে এক এক করে চারটি লাশবাহী গাড়ি এসে থামল বাড়ির উঠানে। ফরিদপুরে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মাদারীপুরের একই পরিবারের ৪ জন মারা গেছেন। একটি পরিবার, চারটি প্রাণ, চারটি কফিন— একসঙ্গে এমন বিদায় কেউ কল্পনাও করেনি। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীর আহাজারিতে পুরো এলাকা স্তব্ধ।
রবিবার সকালে অসুস্থ আলমগীর হোসেনকে (৪০) চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। দুই মাস আগে স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিছুটা সুস্থ হয়েও আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর তাকে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে বাঁচানোর জন্য ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে অ্যাম্বুলেন্সে রওনা দেন ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন (৬৫), তার স্ত্রী বেলী বেগম (৪০) ও আলমগীর হোসেনের স্ত্রী খুরশিদা বেগম খুশি (৩৬)। কিন্তু সেই যাত্রা আর হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছায়নি। ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের নগরকান্দার শংকরপাশা এলাকায় ঢাকাগামী একটি বিআরটিসি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মুহূর্তেই নিভে যায় চারটি জীবন। সঙ্গে প্রাণ হারান অ্যাম্বুলেন্সচালক কাওসার মাতুব্বরও (২২)।
সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে মসজিদের পাশে সারিবদ্ধ চারটি কবর খোঁড়া হয়েছে। যে মানুষগুলো সকালেও ছিলেন পরিবারের ছায়া, বিকেলে তারা নিথর দেহ হয়ে ফিরলেন নিজের উঠানে। এমন দৃশ্য যেন সিনেমাকেও হার মানায়।
নিহত জাহাঙ্গীর হোসেন বিএডিসির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। তার এক ছেলে সিফাত হোসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। মেয়ে সুইটি আক্তার মাদারীপুর সরকারি কলেজে অর্নাস পড়েন। অপর নিহত আলমগীর হোসেন সারের ব্যাবসা করতেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে সুরভী আক্তারকে পড়াশোনা শেষ করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। আরেক মেয়ে স্বর্ণালী আক্তার দশম শ্রেণিতে পড়েন। ছোট ছেলে সিয়াম স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েন। সবচেয়ে বেশি কাঁদছে ছোট্ট সিয়াম। বয়স মাত্র ৯ কিংবা ১০। শারীরিকভাবেও কিছুটা অসুস্থ সে। এক মুহূর্তে হারিয়েছে মা-বাবা দুজনকেই। তার নিষ্পাপ মন হয়ত এখনও পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছে না— এই ঘরে আর কখনও 'মা' বলে ডাকলে কেউ সাড়া দেবে না।
প্রতিবেশীরা বলছেন, আলমগীর ও তার স্ত্রী খুরশিদা অনেক স্বপ্ন নিয়ে নতুন একটি বিল্ডিং তৈরি করেছিলেন। ঘরের কাজও প্রায় শেষ। ঈদের আগেই নতুন ঘরে ওঠার কথা ছিল তাদের। কিন্তু ভাগ্য যেন নির্মম উপহাস করল— নতুন ঘরে ওঠা হলো না, তার আগেই চিরদিনের জন্য চলে গেলেন তারা।
এই পরিবারের আরেকটি বেদনাদায়ক গল্প আছে। প্রায় শতবর্ষী বৃদ্ধ হাজী মোহাম্মদ অহেদ মোল্লা, নিহতদের বাবা— অসুস্থতার কারণে যার একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে— হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। পরিবারের সবাই দেখাশোনা করলেও সবচেয়ে বেশি যত্ন নিতেন মেঝ পুত্রবধূ খুরশিদা। এখন সেই মানুষটিও নেই।
নিহতদের চাচা আ. হামিদ মাস্টারের কণ্ঠে ছিল অসহায় আর্তনাদ— 'পুরো পরিবারটাই যেন শেষ হয়ে গেল। এই বৃদ্ধ বাবাকে এখন কে দেখবে? কারও পরিবারে এমন দিন না আসুক।'
একটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল চারটি প্রাণই নেয়নি; কেড়ে নিয়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি শিশুর আশ্রয়, এক বৃদ্ধ বাবার শেষ ভরসা কিংবা নতুন ঘরে ওঠার রঙিন স্বপ্ন।
/মহু