পবিত্র ঈদুল আজহর দিন যত ঘনিয়ে আসছে, দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী হাকিমপুর উপজেলার হিলি পৌর শহরের কোরবানির পশু ও ছাগলের হাট তত বেশি জমে উঠছে। শেষ মুহূর্তে হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের উপচে পড়া উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এবার সীমান্তে কড়া নিরাপত্তার কারণে ভারতীয় গরু দেশের হাটে প্রবেশ করতে না পারায় দেশি খামারি ও সাধারণ গৃহস্থরা দারুণ খুশি।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাটে দেশি বকনা, গাভী, আড়িয়া এবং শাহীওয়াল জাতের গরু ও ছাগলের ব্যাপক সমাগম ঘটছে। পশুর দাম তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। অন্যদিকে বাকি দিনগুলোতে ভালো দামের আশায় বুক বেঁধেছেন খামারিরা। বাজারে পশুখাদ্যের দাম বেশি থাকলেও, কোরবানির আগে আরও কয়েকটি হাট থাকায় কাঙ্ক্ষিত দামে পশু বিক্রি হবে বলে আশাবাদী তারা।
রোববার (২৪ মে) হিলি পৌর শহরের রাজধানী মোড়ে ঈদুল আজহা উপলক্ষে বসা অস্থায়ী পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাক, ভ্যান ও পিকআপে করে গরু-ছাগল নিয়ে আসছেন খামারি ও গৃহস্থরা। হাটের সুষ্ঠু পরিবেশের কারণে ক্রেতা-বিক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাবেচা করতে পারছেন।
হাট জুড়ে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের দেশি, শাহীওয়াল ও ক্রসসহ বিভিন্ন জাতের গরু-ছাগল দেখা গেছে। বিশেষ করে দেশি জাতের গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। ৫০-৬০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় থেকে দুই লাখ টাকারও বেশি মূল্যের গরু উঠেছে হাটে। ফলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানির পশু কিনতে পারছেন।
কোরবানির পশু কিনতে আসা প্রবাসী ইয়াসিন আলী বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি দিতে দেশে এসেছি। হাটে এসে এক দিনেই নিজের পছন্দমতো ৮২ হাজার টাকা দিয়ে একটি শাহীওয়াল বকনা গরু কিনতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ! পরিবারের সবাই এটি পছন্দ করেছে।
আরেক ক্রেতা ইসমাইল হোসেন বলেন, আমার ও আমার মায়ের গরুর মাংস খাওয়া বারণ। তাই হিলির হাট থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকা দিয়ে একটি দেশি ছাগল কিনলাম।
এদিকে এক ক্ষুদ্র খামারি তার বকনা গরু বিক্রির অনুভূতি জানিয়ে বলেন, দুই বছর ধরে অনেক যত্ন করে গরুটি লালন-পালন করেছি। বাজারে খৈল, ভুসি, গম ও ভুট্টার দাম অনেক বেশি হওয়ায় খরচ অনেক হয়েছে। গরুটি অন্তত ১ লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারলে কিছু লাভ হতো। হাটে ক্রেতারা ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বলছেন, তবে ৯২-৯৫ হাজার টাকার নিচে বিক্রি করলে লোকসান হবে।
হাটের সার্বিক নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুলিশ ও আনসার সদস্যদের তৎপর ভূমিকা দেখা গেছে। এছাড়া পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং গাভীর ক্ষেত্রে গর্ভধারণের বিষয়টি যাচাই করতে কাজ করছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের বিশেষ মেডিকেল টিম।
হাকিমপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোনতাসির মামুন জানান, চলতি বছর উপজেলায় কোরবানির জন্য মোট ১৫ হাজার ৯৮৩টি পশু (গরু, মহিষ ও ছাগল) প্রস্তুত করা হয়েছে। এর বিপরীতে স্থানীয় চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার ২৫০টি পশুর। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ৭৩৩টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। উপজেলায় মোট খামার রয়েছে ৩ হাজার ২৩৯টি। হাটে পশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।
এবারের হিলি কোরবানির পশুর হাটটি পৌর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শাহাবুল ইসলাম ইজারা নিলেও হাট তদারকি করছেন সোহেল হোসেন নামে এক ব্যক্তি। জায়গা সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, হিলি পৌর শহরে স্থায়ী কোনো পশুর হাট না থাকায় আমরা যারা ইজারা নিয়েছি, তাদের এবার লাভের চেয়ে ক্ষতির ব্যবস্থাপনাই বেশি করতে হচ্ছে। আগে পাইলট স্কুল বা কলেজ মাঠে হাট বসত, জায়গা বড় থাকায় পশুর আমদানি বেশি হতো এবং হাসিলের (রসিদ) হারও কম ছিল। কিন্তু এবার স্কুল-কলেজের মাঠ বর্ষার পানিতে ডুবে থাকায় বাধ্য হয়ে প্রধান সড়কের পাশে সংকীর্ণ জায়গায় অস্থায়ী হাট বসাতে হয়েছে। প্রধান সড়কের সামনে সব সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। তবে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সম্মতিক্রমেই হাসিল নেওয়া হচ্ছে, এ নিয়ে কেউ অভিযোগ করেননি।
তবে স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতা ও সাধারণ মানুষের দাবি— আগামীতে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ যেন পশুর হাটের জন্য একটি স্থায়ী ও পর্যাপ্ত জায়গার ব্যবস্থা করে। একই সঙ্গে গরু ও ছাগল কেনাবেচায় কার কাছ থেকে কত টাকা হাসিল নেওয়া হবে, তার একটি নির্দিষ্ট ‘মূল্য তালিকা’ বা চার্ট ঝুলিয়ে দেওয়ারও জোর দাবি জানান তারা।
সময়ের আলো/জোই