প্রাচীন যুগে দূর-দূরান্তের হাজিরা মক্কায় যেভাবে সমবেত হতেন

সময়ের আলো ডেস্ক

ইসলাম

প্রাচীন পৃথিবীতে হজযাত্রা ছিল মানবসভ্যতার অন্যতম বিস্ময়কর ও কষ্টসাধ্য ধর্মীয় ভ্রমণ। আজকের মতো দ্রুতগামী বিমান, আধুনিক সড়ক কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা

2026-05-26T12:40:38+00:00
2026-05-26T12:40:51+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
প্রাচীন যুগে দূর-দূরান্তের হাজিরা মক্কায় যেভাবে সমবেত হতেন
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ১২:৪০ পিএম  আপডেট: ২৬.০৫.২০২৬ ১২:৪০ পিএম
দামেস্ক থেকে আগত হাজিদের উটের কাফেলা, ৩০ দিনের যাত্রা শেষে মক্কার কাছাকাছি। সংগৃহীত ছবি
প্রাচীন পৃথিবীতে হজযাত্রা ছিল মানবসভ্যতার অন্যতম বিস্ময়কর ও কষ্টসাধ্য ধর্মীয় ভ্রমণ। আজকের মতো দ্রুতগামী বিমান, আধুনিক সড়ক কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা তখন ছিল না। তবুও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান বছরের পর বছর ধরে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে মক্কা নগরে পৌঁছাতেন। তাদের এই যাত্রা ছিল শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের উদ্দেশ্যে নয়, বরং এটি ছিল আত্মিক সাধনা, জ্ঞান অনুসন্ধান, সংস্কৃতির আদান-প্রদান এবং বৈশ্বিক মুসলিম ঐক্যের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। 

কেউ চীনের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে যাত্রা শুরু করতেন। তারা মধ্য এশিয়ার মরুভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চল অতিক্রম করে তুর্কি ভূখণ্ড, মাওয়ারাউননাহর ও পারস্য হয়ে ইরাক পৌঁছাতেন। সেখান থেকে বিশাল কাফেলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরব উপদ্বীপের দিকে এগিয়ে যেতেন। আবার কেউ ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে সমুদ্রপথে জাহাজে চড়ে জেদ্দা বন্দরে পৌঁছাতেন। আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্ত, আন্দালুস, মরক্কো, সুদান কিংবা ইউরোপের মুসলমানরাও মাসের পর মাস ভ্রমণ করে হজের কাফেলায় যোগ দিতেন। এই দীর্ঘ যাত্রা অনেক সময় এক বছর বা তারও বেশি স্থায়ী হতো। বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা ও ইবনে জুবাইর–এর মতো অনেক ভ্রমণকারী হজ শেষে বহু বছর পরে নিজ দেশে ফিরে যেতে পেরেছিলেন।

তখনকার হজযাত্রা ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় অভিযান। মানুষ ঘরবাড়ি, ব্যবসা ও পরিবার ছেড়ে অনিশ্চিত এক সফরে বেরিয়ে পড়তেন। পথে ডাকাতের হামলা, পানির সংকট, রোগব্যাধি, তীব্র গরম, মরুভূমির ঝড় এবং খাদ্যের অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। অনেক হাজি যাত্রাপথেই মৃত্যুবরণ করতেন। তবুও তাদের বিশ্বাস ছিল, আল্লাহর ঘর দর্শনের সৌভাগ্য লাভই জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন।

কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিদ ড. আতেফ মোয়াতামেদের মতে, আধুনিক বিশ্বায়নের ধারণা আসার বহু শতাব্দী আগে হজ মুসলিম বিশ্বকে একত্র করেছিল। এটি ছিল এমন এক বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা, যেখানে ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতির মানুষ একই লক্ষ্য নিয়ে একত্র হতো। হজ মানুষকে শুধু ধর্মীয়ভাবে নয়, সামাজিক ও বৌদ্ধিকভাবেও যুক্ত করেছিল। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বায়ন যেখানে প্রায়ই অর্থনৈতিক আধিপত্য বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেখানে হজের বিশ্বায়ন ছিল পারস্পরিক শিক্ষা, সম্মান ও মানবিক সংযোগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা।

এই হজপথগুলোর পাশে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য সভ্যতার নিদর্শন। মরুভূমির মধ্যে নির্মিত হয়েছিল পানির কূপ, বিশ্রামাগার, দুর্গ, খান, মসজিদ ও বাজার। শাসক ও ধনী ব্যক্তিরা হাজিদের সুবিধার জন্য রাস্তা সংস্কার, পানির ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। অনেক স্থানে বিশাল পানির ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে কাফেলাগুলো দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পারে। এসব স্থাপনা ইসলামী সভ্যতার প্রকৌশল ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অসাধারণ উদাহরণ হয়ে আছে।

হজযাত্রা ছিল জ্ঞানচর্চারও একটি বড় মাধ্যম। হাজিরা পথে পথে আলেমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, বিভিন্ন শহরের মাদরাসা ও জ্ঞানকেন্দ্রে অবস্থান করতেন। বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো, কুফা ও মদিনা ছিল জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। হজের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের আলেমদের মধ্যে হাদিস, তাফসির, ফিকহ, সাহিত্য ও ভাষাবিজ্ঞানের জ্ঞান বিনিময় হতো। একজন আফ্রিকান মুসলিম হয়তো বাগদাদে কোনো আলেমের কাছে পড়াশোনা করতেন, আবার মধ্য এশিয়ার কোনো শিক্ষার্থী মদিনায় গিয়ে হাদিস শিক্ষা নিতেন।

হাজিদের যাত্রাপথে “মানাজিল” নামে পরিচিত বিরতি কেন্দ্র ছিল। এখানে তাঁরা বিশ্রাম নিতেন, খাবার সংগ্রহ করতেন এবং অন্য দেশের মুসলমানদের সঙ্গে পরিচিত হতেন। এই মানাজিলগুলো ছিল এক ধরনের আন্তর্জাতিক মিলনমেলা। সেখানে ভাষা, পোশাক, খাবার, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য দেখা যেত। পৃথিবীর নানা অঞ্চলের মুসলমানরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতেন এবং ইসলামী বিশ্বের খবর আদান-প্রদান করতেন।

মক্কার চারপাশে পাঁচটি প্রধান মীকাত ছিল, যেখানে পৌঁছে হাজিদের ইহরাম পরিধান ও হজের নিয়ত করতে হতো। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত কাফেলাগুলো নির্দিষ্ট মীকাত ব্যবহার করত। যেমন, মদিনা থেকে আসা হাজিরা যুলহুলাইফা ব্যবহার করতেন, ইরাকের লোকেরা জাতু ইরক দিয়ে প্রবেশ করতেন, আর ইয়েমেনের কাফেলাগুলো ইয়ালামলাম দিয়ে আসতেন।

সবচেয়ে বিখ্যাত হজপথগুলোর একটি ছিল “দারব জুবাইদা”। এটি ইরাকের কুফা থেকে মক্কা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদ–এর স্ত্রী জুবাইদা এই পথের উন্নয়নে অসাধারণ অবদান রাখেন। তিনি পুরো রাস্তাজুড়ে পানির কূপ, জলাধার ও বিশ্রামকেন্দ্র নির্মাণ করান। তাঁর উদ্যোগে তৈরি পানির ব্যবস্থার কিছু নিদর্শন আজও টিকে আছে। প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ উটের কাফেলায় অতিক্রম করতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগত।

শামি বা সিরীয় হজপথও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বর্তমান জর্ডান, তাবুক ও মদিনা হয়ে মক্কায় পৌঁছাত। উসমানীয় যুগে এই রুটে হিজাজ রেলপথ নির্মিত হলে যাত্রা অনেক সহজ হয়ে যায়। আগে যেখানে এক মাস লাগত, সেখানে ট্রেনে কয়েক দিনের মধ্যেই হাজিরা পৌঁছে যেতে পারতেন। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই রেললাইন ধ্বংস হয়ে যায়।


মিশরীয় হজপথ ছিল আফ্রিকা ও আন্দালুস অঞ্চলের মুসলমানদের প্রধান রুট। কায়রো থেকে বিশাল কাফেলা মরুভূমি অতিক্রম করে সিনাই, আকাবা ও মদিনা হয়ে মক্কায় পৌঁছাত। কখনও তাঁরা নীল নদ ও লোহিত সাগর ব্যবহার করে সমুদ্রপথেও ভ্রমণ করতেন। এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল আধ্যাত্মিকভাবে গভীর।

আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা হাজিদের যাত্রা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ। তাঁরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সুদান ও লোহিত সাগরের উপকূলে পৌঁছাতেন। সেখান থেকে জাহাজে জেদ্দা যেতেন। এই পুরো সফরে এক বছরেরও বেশি সময় লাগত।

ইয়েমেন, ওমান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্যও আলাদা হজপথ ছিল। এসব পথ প্রাচীন বাণিজ্য রুটের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। মরুভূমি, পাহাড় ও উপকূল অতিক্রম করে কাফেলাগুলো মক্কার দিকে এগিয়ে যেত।

এই দীর্ঘ ও কঠিন সফরের কারণেই “হাজি” উপাধি মুসলিম সমাজে অত্যন্ত সম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠে। যারা হজ সম্পন্ন করে ফিরতেন, সমাজ তাদের গভীর শ্রদ্ধার চোখে দেখত। কারণ তারা শুধু একটি ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেননি; বরং জীবন বাজি রেখে এক মহাকাব্যিক যাত্রা সম্পন্ন করেছিলেন।

আজকের যুগে হজযাত্রা অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার বিমানের যাত্রায় মানুষ মক্কায় পৌঁছে যায়। আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত অবকাঠামো হাজিদের কষ্ট অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তবে ড. আতেফ মোয়াতামেদের মতে, এই সহজতা অতীতের সেই গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার অনেকটাই মুছে দিয়েছে। আগে মানুষ দীর্ঘ সফরে ধৈর্য, আত্মত্যাগ ও মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলত। এখন অনেক হাজি মোবাইল ফোন, ছবি তোলা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে থাকেন। অথচ অতীতের হাজিরা একই স্থানে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিকির, তাসবিহ ও ক্ষমা প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকতেন।




/ইউএমএইচ




  বিষয়:   হাজি  মক্কা 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: