‘প্রেমের মানুষ ঘুমাইলে চাইয়া থাকে’ এবং ‘পিরিতের আগুন জ্বলে দ্বিগুণ’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী ও জনপ্রিয় গানের রচয়িতা, প্রবীণ পল্লী বাউল জবান আলী (৯১) আর নেই।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে সুনামগঞ্জ শহরের মেডিকেল রোড এলাকায় তার চাচাতো বোনের বাসায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি ৪ ছেলে, ৫ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (২৭ মে) জোহরের নামাজের পর সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছননগর ঈদগাহ মাঠে এই গুণী বাউলের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পৌর শহরের পাঠানবাড়ি উত্তরপাড়ায় তার নিজের নির্ধারিত ও তৈরি করে রাখা কবরে তাকে দাফন করা হবে।
বাউল জবান আলীর জামাতা ওবায়দুল মুন্সি জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কণ্ঠনালির ক্যানসার, লিভারের জটিলতা ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। গত ১৬ মে তাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে ১৮ মে হাসপাতাল থেকে তাকে মেডিকেল রোডের বাসায় নিয়ে আসা হয় এবং সেখানেই তিনি শেষ বিদায় নেন।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভোকালকর্ড জটিলতায় কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন এই প্রবীণ বাউল। যে কণ্ঠে একসময় পালাগান আর বাউল গানের আসর মাততো, জীবনের শেষ দিনগুলোয় সেই কণ্ঠে আর কোনো শব্দ ফোটেনি। অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় দিন দিন তার শারীরিক জটিলতা বাড়ছিল। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছননগর এলাকায় দুটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই কেটেছে এই গুণী শিল্পীর শেষ জীবন।
বোঝার বয়স থেকেই গানে মজে ছিলেন জবান আলী। জীবন-যৌবন সঁপে দিয়েছিলেন সুরের ভুবনেই। তার দাদা বাউল আব্দুল গণি ও বাবা বাউল আব্দুল মতলিবের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে গান লেখা শুরু করেন তিনি। তার লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন কুমার বিশ্বজিৎ, অলক বাপ্পা, কাজী শুভ, খায়রুল ওয়াসীন, ঝুমা, মুনসহ দেশের প্রথম সারির অনেক শিল্পী। এছাড়া চলচ্চিত্রে তার লেখা বিখ্যাত গানগুলো গেয়েছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বেবি নাজনীন ও মনির খান।
বাউল জবান আলীর গানে প্রেম-বিরহের পাশাপাশি আধ্যাত্মিকতা, সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর ভক্তি এবং সমাজের নানা অসঙ্গতির চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি তার জীবনে ৭০০-এর বেশি গান লিখেছেন। তবে এর মধ্যে মাত্র ১০০টি গান নিয়ে দুটি বই ছাপা হয়েছে। বাকি গানগুলো এখনও পাণ্ডুলিপি আকারেই রয়ে গেছে। গত বছর সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে ‘অমাবস্যার কালে’ নামে একটি বাউল গানের সংকলন প্রকাশিত হয়, যেখানে জবান আলীর অপ্রকাশিত ৩৫টি গানসহ তার বাবা ও দাদার কিছু গান স্থান পায়।
মৃত্যুর পরেও যেন মানুষ তাকে ভুলে না যায়, সেই ভাবনা থেকে প্রায় ১২ বছর আগে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছিলেন এই বাউল। তিনি পৌর শহরের পাঠানবাড়ি উত্তরপাড়ায় ১০ শতক জায়গা কিনে নিজের কবর খুঁড়ে পাকা করে রেখেছিলেন। পাশেই মসজিদ নির্মাণের জন্য খালি জায়গা রেখে গেছেন। জীবনের সব সুর সাঙ্গ করে নিজের তৈরি সেই চিলতে মাটিতেই এবার চিরনিদ্রায় শায়িত হতে যাচ্ছেন এই লোকসংগীতের নক্ষত্র।
তার মৃত্যুতে সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাঙালয় সুনামগঞ্জ থিয়েটারের সভাপতি মেহেদী হাসান জানান, বাউল জবান আলী ছিলেন আমাদের লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তিন পুরুষের যে গানের ধারা তিনি বহন করছিলেন, তা আজ এক বড় ধাক্কা খেল। তার অপ্রকাশিত শত শত গান সংরক্ষণ করা এখন আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
সুনামগঞ্জ জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক পাবেল জানান, বাউল জবান আলী ছিলেন আমাদের লোকসংগীতের এক অমূল্য রতন। জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে আজ তার পরিবারকে সামান্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই গুণী শিল্পীর বাকি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য সরকারিভাবে আমরা ৫০টি গান সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি।
সময়ের আলো/জোই