মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে বড় বাধা ‘আলো দূষণ’, হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ আমেরিকার চিলির আটাকামা মরুভূমি— অনন্ত নক্ষত্রবীথি আর মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনের জন্য পৃথিবীর বুকে অন্যতম সেরা এক স্বর্গরাজ্য। কিন্তু মানুষের

2026-05-30T13:47:28+00:00
2026-05-30T13:48:18+00:00
 
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে বড় বাধা ‘আলো দূষণ’, হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ১:৪৭ পিএম  আপডেট: ৩০.০৫.২০২৬ ১:৪৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ আমেরিকার চিলির আটাকামা মরুভূমি— অনন্ত নক্ষত্রবীথি আর মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনের জন্য পৃথিবীর বুকে অন্যতম সেরা এক স্বর্গরাজ্য। কিন্তু মানুষের তৈরি কৃত্রিম আলোর ধীর ও নিঃশব্দ আগ্রাসন এখন এই অঞ্চলের আদিম অন্ধকারকে গ্রাস করতে বসেছে। বিশ্বজুড়ে আলো দূষণ (লাইট পলিউশন) কতটা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে, আটাকামার বর্তমান পরিস্থিতি তারই এক আশঙ্কাজনক ইঙ্গিত।

রাত তখন দুইটা। চিলির আটাকামা মরুভূমির চারপাশ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিমজ্জিত। ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার ঘরে চোখের পাতা খোলা নাকি বন্ধ, তা বোঝার উপায় নেই। কিন্তু ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে মরুভূমির বুকে পা রাখতেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। মাথার ওপরে জেগে ওঠে এক উজ্জ্বল, প্রদীপ্ত এবং আদিম আকাশ। যেখানে খালি চোখেই স্পষ্ট দেখা যায় দূর গ্যালাক্সির মেঘমালা। এই চিরন্তন অন্ধকারের কারণেই বিশ্বের বাঘা বাঘা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে ছুটে আসেন চিলির ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরিতে (ইএসও)।

লন্ডন, নিউইয়র্ক বা ঢাকার মতো মেগাসিটিগুলোর আকাশে তাকালে কোটি কোটি বৈদ্যুতিক বাতির কৃত্রিম আলোর চাদর ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। কিন্তু আটাকামায় আকাশ যেন নক্ষত্রের ঘন বুননে তৈরি এক জীবন্ত ক্যানভাস। খালি চোখে দেখা যায় মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথের সাদা রেখা এবং প্রায় ২ লাখ আলোকবর্ষ দূরের দুই বামন গ্যালাক্সি— ম্যাজেলানিক ক্লাউড।

তবে বিজ্ঞানীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। প্রতি বছরই এই মরুভূমির চারপাশের শহর, শিল্পাঞ্চল ও খনি প্রকল্পগুলো থেকে নির্গত কৃত্রিম আলো পরিচ্ছন্ন রাতের আকাশকে ক্রমশ ঝাপসা করে দিচ্ছে। এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে আলো দূষণের কারণে আকাশের উজ্জ্বলতা প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ করে বেড়েছে। এর সহজ অর্থ হলো, এক দশক আগে আকাশের যে অংশে একজন মানুষ ২৫০টি তারা দেখতে পেতেন, এখন সেখানে মাত্র ১০০টি তারা দৃশ্যমান হয়।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আকাশ থেকে তারাদের এই হারিয়ে যাওয়া মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা আমাদের প্রকৃতির সাথে দীর্ঘদিনের আত্মিক বন্ধনকে ছিন্ন করে। অন্যদিকে পরিবেশবিদরা বলছেন, কৃত্রিম আলোর কারণে দিন ও রাতের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হওয়ায় উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনচক্র এবং সামগ্রিক ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মুখে পড়ছে। সে কারণেই অনেক গবেষক এখন অতিরিক্ত আলোকে বায়ু বা পানি দূষণের মতোই একটি ‘কঠিন দূষক’ (হার্ড পলুট্যান্ট) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার দাবি তুলছেন।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ইএসও-এর প্যারানাল অবজারভেটরি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী টেলিস্কোপ ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ (ভিএলটি)-এর আবাসস্থল। এই কেন্দ্র থেকেই মানবজাতি প্রথম কোনো এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহের সরাসরি ছবি পেয়েছিল এবং আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিল। ২০২৭ সালের মধ্যে এখানে আরও বড় ‘এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ’ (ইএলটি)-এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

অন্ধকারকে বাঁচাতে এই কেন্দ্রে রাতে গাড়ির হেডলাইট জ্বালানো নিষিদ্ধ এবং ভবনের সমস্ত জানালা ভারী পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। এতদিন মানুষের অনুপস্থিতি এবং শহরের বিশাল দূরত্বই ছিল এই কেন্দ্রের প্রধান বর্ম। কিন্তু সম্প্রতি খনি ও জ্বালানি শিল্পগুলো ক্রমশ প্যারানালের দিকে এগিয়ে আসছে।

সম্প্রতি ‘ইন্না কমপ্লেক্স’ নামের একটি বিশাল শিল্প প্রজেক্ট প্যারানালের মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। ইএসও-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রজেক্টের কারণে টেলিস্কোপের ওপর আলো দূষণ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যেত। তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৬ সালের শুরুতে ওই কোম্পানি প্রকল্প থেকে পিছিয়ে আসার ঘোষণা দিলেও বিজ্ঞানীদের ভয় কাটেনি। চিলির ইউনিভার্সিটি অফ অ্যান্টিফাগাস্তার জ্যোতির্বিজ্ঞানী এদুয়ার্দো উন্দা-সানজানা বলেন, আইনি কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়নি। আজ একটি প্রজেক্ট বাতিল হয়েছে, কিন্তু ২০২৬ সালের শেষেই একই আইনি ফাঁকফোকর গলে আরেকটি নতুন প্রকল্প চলে আসতে পারে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (আইএইউ) এই আলো দূষণের সর্বোচ্চ সীমা ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার নতুন গাইডলাইন দিয়েছে। কারণ প্যারানালের মতো হাতেগোনা কয়েকটি কেন্দ্রই এখন পৃথিবীতে বেঁচে আছে যেখানে আলো দূষণ ১ শতাংশের কম। বিজ্ঞানীরা এখন চিলির সরকারের কাছে একটি বিশেষ নীতিমালার জন্য তদবির করছেন, যা কর্তৃপক্ষকে আলো দূষণের সীমা ছাড়ালে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার এবং বাতি নিভিয়ে বা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিক অন্ধকার ফিরিয়ে আনার আইনি ক্ষমতা দেবে।

মহাকাশে জেমস ওয়েব-এর মতো টেলিস্কোপ থাকলেও, মহাবিশ্বের অতি সুক্ষ্ম বিবরণের জন্য পৃথিবীর বুকে বসানো বিশাল আয়নার এই টেলিস্কোপগুলোর কোনো বিকল্প নেই। বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই অন্ধকারকে যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তবে মানবজাতি কেবল বিজ্ঞানকেই হারাবে না, বরং আমরা যে মহাবিশ্বে বাস করছি, তা থেকে নিজেদের চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে ফেলব। আজ থেকে ৫০ বছর আগে পৃথিবীতে অন্ধকারের কোনো অভাব ছিল না, আর আজ তা বিলুপ্তপ্রায় সম্পদ।

সূত্র: বিবিসি

/কহু 
  বিষয়:   আলো  দূষণ 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: