আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট হয় যেভাবে

মিজানুর রহমান

ইসলাম

মানুষের পক্ষে আত্মীয়স্বজন ছাড়া চলা সম্ভব নয়। আত্মীয়স্বজনরাই সবার আগে বিপদাপদে পাশে দাঁড়ায় এবং ভালোবাসায় আগলে রাখার দৃশ্যের অবতারণা করে।

2026-06-02T15:18:41+00:00
2026-06-02T15:18:41+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট হয় যেভাবে
মিজানুর রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ৩:১৮ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
মানুষের পক্ষে আত্মীয়স্বজন ছাড়া চলা সম্ভব নয়। আত্মীয়স্বজনরাই সবার আগে বিপদাপদে পাশে দাঁড়ায় এবং ভালোবাসায় আগলে রাখার দৃশ্যের অবতারণা করে। ধরুন কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে প্রথমেই খোঁজ নেয় আত্মীয়সূত্রের বা পরিচিত কোনো ডাক্তার আছে কি না, যার দ্বারা চিকিৎসা সুচারুরূপে বাস্তবায়ন করা যাবে। আর খোঁজ নেবেনই না কেন; একজন আত্মীয় ডাক্তার বা হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কেউ যতটা আন্তরিক হবে, তা অন্য ডাক্তারের কাছে পাওয়া মুশকিল। আত্মীয়রা জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সহযোগী নয় কেবল, পরোক্ষভাবেও তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আমি নবী করিম (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত ও আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৫)

কিন্তু বিপরীতে দেখছি দিন যত গড়াচ্ছে আত্মীয়তার আত্মিক বন্ধনে শোচনীয়ভাবে ভাটা পড়ছে। যেন এই সম্পর্কের জোয়ার বলতে কিছু নেই। আমাদের চারদিকের এমন অনেক বন্ধুত্বহীন, পারস্পরিক সম্মানহীন, প্রাণহীন ও প্রেমহীন আত্মীয়তার সম্পর্ক অহরহ দেখতে পাই। বস্তুবাদী সভ্যতায় আত্মীয়তার সম্পর্কটা রয়েছে কেবল স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। অথচ তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতিতে যোগাযোগব্যবস্থার এতটা উন্নত হয়েছে, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সহজে পারস্পরিক সুখ-দুঃখের আদান-প্রদান করা যায়। এতদাসত্ত্বেও আত্মীয়তার বন্ধন দিন দিন আমাদের মুসলিম সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। কোন কারণে কীভাবে আমরা আত্মীয়তার সুসম্পর্কের ইতি টানছি সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নিই-
আরও পড়ুন

দীর্ঘদিন দেখা-সাক্ষাৎ না হওয়া : ব্যস্ততার অজুহাত কিংবা নানা রকমের উপলক্ষ দাঁড় করিয়ে লম্বা সময় পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ না হওয়া। এতে নিজেদের মাঝে ক্রমান্বয়ে আন্তরিকতায় ভাটা পড়ে। ফলে একটা সময় সম্পর্কছিন্নে রূপান্তরিত হয়।

একে অন্যকে মূল্যায়ন না করা : পরস্পরে মূল্যায়ন না হওয়ার একটা মারাত্মক ব্যাধি হচ্ছে নিজেকে বড় মনে করা, দাম্ভিকতার আচরণ করা। অন্যদের তুচ্ছ দৃষ্টিতে তাকানো। আমাদের সমাজে এমন কিছু আত্মীয় রয়েছে যারা অনেক উচ্চপদে আসীন হয়েছে। সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জন করেছে অথবা বড় বিত্তশালী হয়েছে। কিন্তু আত্মীয়স্বজন তার কাছে ঘেঁষাকে মানহানি ও লজ্জাকর মনে করে। এভাবে বিভিন্ন সাক্ষাতে কিংবা মতামতের ক্ষেত্রে কঠিনভাবে হেয় করা ও ঘায়েল করে কথা বলা। যার ফলে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের আগ্রহ থাকে না এবং মতামত আদান-প্রদান করার ন্যূনতম ইচ্ছার জায়গায় ওই আত্মীয়ের প্রতি ঘৃণ্যবোধ সৃষ্টি হয়।

অন্যের প্রতি হিংসামূলক আচরণ : আত্মীয়দের কারও উন্নতি চোখে পড়লে বা যে পদ্ধতি অবলম্বন করলে উন্নতির সিঁড়িতে চড়তে পারবে; সে জায়গায় নানা ফাঁদ পাতা যাতে সে আগে বাড়তে না পারে। বহুসময় একটা জায়গা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বললে একজনের সুযোগ-সুবিধার পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। এভাবে কোথাও একটু পরামর্শমূলক দিকনির্দেশনা না করার কারণে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু সে জায়গায় হিংসা মনোভাব নিয়ে চুপ থাকা হয়। যা আত্মীয়তার বন্ধনে চরম আঘাত হানে।

মূল্যায়ন না করা : মূল্যায়ন না হওয়ার আরেকটা বড় সমস্যা হচ্ছে কৃপণতা ও সংকীর্ণতার আচরণ করা। আত্মীয়স্বজন মেহমান হিসেবে আগমন করলে চেহারা মলিন হয়ে যায়। মেহমানদের তেমন একটা গুরুত্ব দিয়ে সময় বা খোঁজখবর না নেওয়া। সামর্থ্য অনুপাতে আপ্যায়ন না করা। যার ফলে পুনরায় মেহমান হওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

আর্থিক লেনদেন অস্বচ্ছতা : অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য অনেক সময় যৌথ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। আর অল্প সময় আর্থিকভাবে চাঙ্গা হওয়ার দ্রুত ফলপ্রসূ পদ্ধতি হলো শেয়ারে ব্যবসা-বাণিজ্যে করা। কিন্তু দেখা যায় আর্থিক উন্নতি তো দূরের কথা সম্পর্ক পর্যন্ত ছিন্ন হয়ে যায়। কারণ একে অন্যের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা। আমানতের খেয়ানত করা। ছোট থেকে বড় বিষয়ে ধৈর্যের পরিচয় না দেওয়া। হিসাব-নিকাশে ছলচাতুরী করা। দায়িত্বে যথাযথ সময় ব্যয় না করা। বিশেষ করে ব্যবসার লোকসানের সময় ধৈর্যের সঙ্গে একে অন্যের পাশে না থাকা।

পরিবারের লোকদের গুরুত্ব না দেওয়া :
একটা পরিবারে মা-বাবা, ভাই-বোন যেমন অপরিসীম গুরুত্ব তদ্রুপ নিজের সহধর্মিণীও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের জন্য আমার মা যেমন আমার স্ত্রীও তার সন্তানের কাছে মা তেমন। কিন্তু সমাজে অনেক পুরুষ স্ত্রীর কথার ফাঁদে পড়ে নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি ঘটায়। এর বিপরীতে অনেকে মা-বোনের কথার ওপর নির্ভর করে স্ত্রী ও তার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে। যা স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সুখকর জীবনের বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে যায়।

প্রাপ্য সম্পত্তি বণ্টনে গড়িমসি করা : মা-বাবার মৃত্যুর পর ভাই-বোনরা সম্পত্তির অধিকার লাভ করে। কিন্তু দেখা যায় এ ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত সম্পত্তির দ্রুত সময়ে বণ্টন না করার ফলে অনেকের প্রাপ্য সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। অনেক মা-বোন ভাইদের সঙ্গে না পেরে চিরতরে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। আমাদের সমাজে এ রকম অহরহ বোন, মা-খালা ও ফুপুরা রয়েছে যারা তাদের প্রাপ্য সম্পত্তি না পাওয়ার দরুন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে। এ ছাড়াও আরও নানা বিষয় আছে, যা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতে সহায়তা করে। এই সমস্যাগুলো প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে। তারপর অপনোদন করার চেষ্টা করতে হবে। ফলে ধীরে ধীরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে প্রেমময় ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।

পবিত্র কুরআন ও হাদিসের ছত্রে ছত্রে এমন খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। বলা হয়েছে সম্পর্ক রক্ষার মৌলিক সূত্র। কিন্তু অজান্তেই অনেক সময় আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলছি। হয়তো জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে। বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণ করতে পারলে পৃথিবীর জীবনটা তো শান্তিপূর্ণ হবেই পরকালেও মিলবে অফুরন্ত পুরস্কার-প্রতিদান ইনশাআল্লাহ।

এএডি/


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: