মায়ের বুকভরা অপেক্ষার শেষ ছিল না। ১১ বছর পর প্রবাস থেকে ফিরছিলেন আদরের ছেলে। আগামীকালই যাওয়ার কথা ছিল পাত্রী দেখতে। বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু ঘরে ফেরার আগেই সব আনন্দ কেড়ে নিয়ে গেল এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা।
মঙ্গলবার (০২ জুন) ভোরে মালয়েশিয়া ফেরত ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় মা ও প্রবাসী ছেলেসহ একই পরিবারের ৪ জন নিহত হয়েছেন। মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় গাড়িটি। সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই শেষ হয়ে যায় এক পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন।
নিহতরা হলেন, মালয়েশিয়া প্রবাসী আরিফ ইসলাম, তার মা নুরজাহান বেগম, ভাই রাকিব, আত্মীয় আয়শা বেগম এবং গাড়িচালক জাহিদ। গুরুতর আহত দুই শিশু আশরাফুল ও তাছফিয়া হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
আরিফের গল্পটা ছিল সংগ্রামের। মাত্র ১৮ বছর বয়সে অভাবের সংসারের হাল ধরতে পাড়ি জমিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। দীর্ঘ ১১ বছর প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। ভূমিহীন পরিবারটির জন্য কিনেছিলেন ৫ শতক জমি, তৈরি করেছিলেন মাথা গোঁজার একটি ঘর। যে ঘরে ফেরার স্বপ্নে দিন গুনছিলেন তিনি, সেই ঘরে তার জীবিত ফেরা হলো না।
সোমবার গভীর রাতে বিমানবন্দরে নামেন আরিফ। তাকে বরণ করে নিতে ছুটে যান মা নুরজাহান, ভাই-বোন, স্বজনরা। কতদিন পর ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন মা! হয়ত ভেবেছিলেন এবার ছেলেকে কাছে পাবেন, তার বিয়ে দেবেন, সংসারে নতুন মুখ আসবে। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার পথই হয়ে উঠল মৃত্যুর অনন্ত যাত্রা।
আরিফের মামা নজরুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘১১ বছর পর দেশে ফিরেছিল। কালই মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। মা নিজে বিমানবন্দরে গিয়েছিল ছেলেকে আনতে। ফেরার পথেই সব শেষ হয়ে গেল। বাবা ছাড়া পরিবারে আর কেউ রইল না।’
প্রতিবেশীরা জানান, একসময় ভূমিহীন এই পরিবারে অভাব ছাড়া কিছুই ছিল না। আরিফের রক্ত-ঘামে বদলে গিয়েছিল সেই ভাগ্য। সংসারে ফিরেছিল স্বচ্ছলতা। কিন্তু সুখের সেই দিনগুলো উপভোগ করার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে গেল।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য এখন আরিফদের বাড়িতে। যে বাড়িতে আজ আনন্দের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই কান্নার শব্দ। যে মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ঘরে ফিরতে চেয়েছিলেন, সেই মা-ছেলে আজ ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে। আগামীকাল যেখানে পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ চলছে জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি।
পরিবারের পাঁচ সদস্যের মধ্যে কেবল বাবা শহিদুল ইসলাম বেঁচে আছেন। কারণ তিনি বাড়িতেই ছিলেন। এক মুহূর্তে স্ত্রী, সন্তান, স্বজন— সব হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি। তার চোখের সামনে ভেঙে পড়েছে পুরো পৃথিবী।
স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোসলেম উদ্দিন জানান, তাদের বাড়ি ছাড়া কোনও জমি নেই। ফলে, আমার পারিবারিক কবরস্থানেই তাদের দাফন করা হবে।
/মহু