গ্রেট নিকোবর কী চীনের বিরুদ্ধে ভারতের ‘হরমুজ’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ভারতের দক্ষিণতম ভূখণ্ড গ্রেট নিকোবর দ্বীপ বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে বিতর্কিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার দ্বীপটিকে একটি বৃহৎ

2026-06-05T19:46:55+00:00
2026-06-05T20:02:04+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
গ্রেট নিকোবর কী চীনের বিরুদ্ধে ভারতের ‘হরমুজ’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ৭:৪৬ পিএম  আপডেট: ০৫.০৬.২০২৬ ৮:০২ পিএম  (ভিজিট : ১২)
গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড প্রকল্পের আওতায় ক্যাম্পবেল বে সংলগ্ন বনভূমি চিরে নতুন সড়ক নির্মাণ চলছে। ছবি : আল-জাজিরা
ভারতের দক্ষিণতম ভূখণ্ড গ্রেট নিকোবর দ্বীপ বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে বিতর্কিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার দ্বীপটিকে একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত কেন্দ্রে রূপান্তর করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা যেমন ভারতের সামুদ্রিক শক্তি বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি এটি পরিবেশ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও উত্থাপন করছে। 

কেন গ্রেট নিকোবর গুরুত্বপূর্ণ?

গ্রেট নিকোবর ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে এটি ভারতের চেয়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের অনেক কাছাকাছি। দ্বীপটি মালাক্কা প্রণালীর পশ্চিম প্রবেশমুখের কাছে অবস্থান করছে।

মালাক্কা প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়ায় তেল, গ্যাস ও পণ্যবাহী জাহাজের বিশাল অংশ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। 

বিশেষ করে চীনের জন্য মালাক্কা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ এই প্রণালী দিয়ে আসে। ফলে মালাক্কা প্রণালীকে অনেক কৌশলবিদ চীনের ‘মালাক্কা সংকট’ বলে উল্লেখ করেন—অর্থাৎ এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে চীনের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা বড় সংকটে পড়তে পারে।


ভারতের ১১ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা 

ভারত সরকার গ্রেট নিকোবরে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো এবং নতুন নগরায়ণ প্রকল্প। এটি প্রায় ৩.৫ লাখ মানুষের জন্য আবাসন তৈরি করেছে। 

বর্তমানে পুরো দ্বীপে ১০ হাজারেরও কম মানুষ বাস করে। কিন্তু আগামী কয়েক দশকে সেখানে ৩.৫ লাখ মানুষের বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ জনসংখ্যা প্রায় ৪০ গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। 

সরকারের মতে, এই প্রকল্প ভারতকে সিঙ্গাপুর, হংকং বা কলম্বোর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। 

কীভাবে এটি ভারতের কৌশলগত সম্পদ 

প্রথমদিকে সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বললেও পরবর্তীতে প্রকল্পটির সামরিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বেশি করে তুলে ধরতে শুরু করে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, গ্রেট নিকোবর থেকে মালাক্কা প্রণালীতে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী জাহাজগুলো সহজে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এর ফলে ভারত সমুদ্রপথে নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে পারবে।

বর্তমানে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের ত্রিবাহিনী কমান্ড রয়েছে। গ্রেট নিকোবর উন্নত হলে ভারতীয় নৌ ও বিমান শক্তির কার্যক্রম আরও দক্ষিণে বিস্তৃত হবে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের উপস্থিতি শক্তিশালী হবে। 

ভারতের কিছু কৌশলবিদ যুক্তি দেন যে, ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে সংঘাত হলে গ্রেট নিকোবর ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হতে পারে। যেমন ইরান হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তেমনি ভারতও মালাক্কা অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে পারবে।

তাহলে কি এটি সত্যিই ভারতের ‘হরমুজ’ 

অনেক গণমাধ্যমে গ্রেট নিকোবরকে ভারতের সম্ভাব্য ‘হরমুজ-ধরনের ভূরাজনৈতিক প্রভাব’ বা ‘ভারতের হরমুজ’ বলা হলেও সামরিক বিশেষজ্ঞরা এই তুলনাকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। 

কারণ হরমুজ প্রণালী সরাসরি ইরান ও ওমানের ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত। কিন্তু মালাক্কা প্রণালী মূলত ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রণাধীন আন্তর্জাতিক জলপথ।

অতএব ভারত সেখানে একতরফাভাবে কোনো অবরোধ আরোপ করতে পারবে না। তাছাড়া মালাক্কা দিয়ে ভারত নিজেও বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য পরিচালনা করে। ফলে যুদ্ধ না হলে এই পথ বন্ধ করার কোনো বাস্তবিক যুক্তি নেই।

সাবেক নৌ কর্মকর্তা শেখর সিনহার মতে, একটি সামুদ্রিক অবরোধ তৈরি করা যত সহজ, তা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর রাখা ততটাই কঠিন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো নৌশক্তিও অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অবরোধ বজায় রাখতে হিমশিম খায়।

পরিবেশগত উদ্বেগ

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে পরিবেশবিদদের কাছ থেকে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৬৪ হাজার গাছ কাটা হবে।

গ্রেট নিকোবর ভারতের অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল। এখানে বহু বিরল প্রাণী, উদ্ভিদ এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র রয়েছে। বিশাল আকারে বন উজাড়, রাস্তা নির্মাণ, বন্দর ও নগরায়ণ প্রকল্প দ্বীপটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আদিবাসীদের অস্তিত্ব সংকট

দ্বীপটিতে শম্পেন এবং নিকোবারিজ নামে দুটি প্রধান আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাস করে। বিশেষ করে শম্পেনরা আধা-যাযাবর শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী, যারা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ রাখে।

প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত এলাকার একটি বড় অংশ তাদের সংরক্ষিত ভূমির মধ্যে পড়ে।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ৩৯ জন গণহত্যা ও আদিবাসী অধিকার বিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেন যে এই প্রকল্প শম্পেন জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকেই বিপন্ন করতে পারে।

তাদের মতে, ব্যাপক জনবসতি ও বাইরের মানুষের আগমন শম্পেনদের সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে।

ভূমিকম্প ও সুনামির ঝুঁকি

গ্রেট নিকোবর ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। এটি ভারতের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সর্বোচ্চ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। ২০০৪ সালের সুনামির সময় দ্বীপের দক্ষিণাংশ প্রায় ৪.২৫ মিটার নিচে নেমে যায় এবং অনেক এলাকা স্থায়ীভাবে ডুবে যায়।

এই অভিজ্ঞতার কারণে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন—এত বড় অবকাঠামোগত বিনিয়োগ কি ভূতাত্ত্বিকভাবে নিরাপদ?

গ্রেট নিকোবর প্রকল্পকে ঘিরে মূল বিতর্কটি হলো উন্নয়ন বনাম সংরক্ষণ। সরকারের দৃষ্টিতে এটি ভারতের জন্য একটি ভবিষ্যতমুখী কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের প্রভাব বাড়াবে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির মোকাবিলায় সহায়ক হবে।

অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, প্রকল্পটি পরিবেশ ধ্বংস, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্থানচ্যুতি এবং ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্যই বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ফলে গ্রেট নিকোবর আজ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি ভারতের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও আদিবাসী অধিকার—এই চারটি বড় প্রশ্নের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে।


সূত্র : আল-জাজিরা

/ইউএমএইচ 




  বিষয়:   গ্রেট নিকোবর  চীন  ভারত  হরমুজ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: