ইউরোপের দেশ আলবেনিয়ার পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর ও সুরক্ষিত একটি প্রাকৃতিক জলাভূমি এলাকায় বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণের এক প্রকল্পের বিরুদ্ধে তীব্র গণবিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে দেশের সাধারণ মানুষ ও পরিবেশবাদীরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের মালিকানাধীন অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাফিনিটি পার্টনারস’-এর প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউরোর এই মেগা প্রকল্পের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দেশটির রাজধানী তিরানার রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার ক্ষুব্ধ মানুষ।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই বিশাল রিসোর্টটি নির্মিত হলে দেশটির কয়েক শ হেক্টর মনোরম সমুদ্রসৈকত সম্পূর্ণ ধ্বংস ও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই ভিয়োসা-নার্তা সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকাটি মূলত বিশ্বখ্যাত গোলাপি ফ্ল্যামিঙ্গো পাখি, বিরল প্রজাতির সিল মাছের স্থায়ী আবাসস্থল এবং বিপন্ন সামুদ্রিক কচ্ছপের অন্যতম প্রধান প্রজননকেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত পরিচিত।
এই প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করে আলবেনিয়ার প্রখ্যাত পক্ষীবিদ লেডি সেলজেকায় রয়টার্সকে জানান, সমগ্র বিশ্বের মোট ফ্ল্যামিঙ্গো পাখির ১ শতাংশেরও বেশি আলবেনিয়ার এই বিশেষ জলাভূমিতে বাস করে। তিনি স্পষ্ট করেন যে দেশের অর্থনীতির জন্য বিদেশি বিনিয়োগ আসাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই ধরণের সংবেদনশীল সংরক্ষিত এলাকাকে কোনোভাবেই বাণিজ্যিক স্বার্থে নষ্ট করা যাবে না।
গত সপ্তাহে ওই সুরক্ষিত এলাকায় মাটি কাটার ভারী যন্ত্রপাতি আনা এবং প্রাথমিক কাজ শুরু হওয়ার পরই মূলত স্থানীয়ভাবে বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে, যা পরবর্তীতে রাজধানী তিরানায় বিশাল রাজনৈতিক গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।
বিক্ষোভের দিন হাজার হাজার আন্দোলনকারী আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এডি রামার সরকারি কার্যালয়ের বাইরে জড়ো হয়ে তার পদত্যাগ দাবি করেন। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল এই অঞ্চলের প্রতীক গোলাপি রঙের ফ্ল্যামিঙ্গো পাখির বড় প্রতিকৃতি এবং তারা ‘বিপ্লব’ ও ‘প্রকল্প বন্ধ করো’ বলে চারদিকে স্লোগান দিতে থাকেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দেশটির বিশিষ্ট লেখিকা লিন্ডিতা কোমানি বলেন, ‘আলবেনিয়া কোনো বিক্রির বস্তু নয়। আলবেনিয়া এ দেশের সাধারণ মানুষের এবং এখানে কী উন্নয়ন হবে তা আমরাই ঠিক করব। শাসন ক্ষমতায় থাকা গুটিকয় দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে যা খুশি তা-ই করতে পারেন না’।
অবশ্য আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এডি রামা এই মেগা প্রকল্পের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। আলবেনিয়ার অর্থনীতি ও উদ্ভাবন মন্ত্রী ডেলিনা ইব্রাহিমাজ জানান, প্রস্তাবিত এই মার্কিন বিনিয়োগের জন্য বর্তমানে পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের একটি খসড়া তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রকল্পটিকে অবশ্যই দেশের পরিবেশ আইন পুরোপুরি মেনে চলতে হবে।
আলবেনিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘এটিএ’ তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, ইউরোপীয় পরিবেশগত নির্দেশিকা অনুযায়ী সংরক্ষিত উপহ্রদ ও আশপাশের পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে এমন যেকোনো প্রকল্পের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষার পূর্ণ নিশ্চয়তা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে জ্যারেড কুশনার এই বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন, যার অধীনে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের সাবেক সেনাসদর দপ্তরেও একটি বিলাসবহুল কমপ্লেক্স বানানোর কথা ছিল, তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র বিক্ষোভের মুখে গত বছর কুশনার সার্বিয়ার সেই প্রকল্প থেকে সম্পূর্ণ পিছু হটতে বাধ্য হন।
সূত্র: রয়টার্স
সময়ের আলো/টিএইচ