বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের সামগ্রিক ভাবমূর্তি এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর সাধারণ মানুষের বৈশ্বিক আস্থা নজিরবিহীনভাবে হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর এই নেতিবাচক মনোভাব আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে।
বিশ্বের তিন ডজন দেশে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক বিশেষ বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, জরিপভুক্ত দেশগুলোর সিংহভাগ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি চরম অসন্তোষ পোষণ করেন, যার মধ্যে ইসরায়েল বিরোধী মনোভাবের দিক থেকে বৈশ্বিকভাবে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে তুরস্ক এবং সবচেয়ে কম নেতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে ভারতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত ‘স্প্রিং ২০২৬ গ্লোবাল অ্যাটিটিউড সার্ভে’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের অফিশিয়াল তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত বিশ্বের ৩৬টি স্বাধীন রাষ্ট্রে এই জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর প্রাপ্ত সামগ্রিক তথ্যের গড় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলের বর্তমান নীতি ও সামরিক আগ্রাসনের প্রতি চরম অসন্তোষ বা তীব্র নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন; এর বিপরীতে মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষ দেশটির প্রতি কিছুটা ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।
প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ইসরায়েল বিরোধী এই মনোভাব সবচেয়ে তীব্র রূপ ধারণ করেছে এবং বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রেকর্ড পরিমাণ ক্ষোভ দেখা গেছে।
এর মধ্যে তুরস্ক ৯৭, পাকিস্তান ৯৫ ও বাংলাদেশে ৭৯ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন; তবে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় এই জরিপ চালানো সম্ভব হয়নি বলে পিউ রিসার্চ সেন্টার দুঃখ প্রকাশ করেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউরোপের দেশগুলোতেও ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান এবং ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের মতো দেশগুলোতে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক জানিয়েছেন যে ইসরায়েলের প্রতি তাদের মনোভাব অত্যন্ত প্রতিকূল। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে একমাত্র সাব-সাহারা অঞ্চলের কয়েকটি আফ্রিকান দেশ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে ইসরায়েলের পক্ষে তুলনামূলক ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে; যেখানে নাগরিকদের মধ্যে ইসরায়েল বিরোধী মনোভাবের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম।
এই জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবীণদের তুলনায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব অনেক বেশি প্রবল। উদাহরণস্বরূপ, হাঙ্গেরিতে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে ৭২ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলকে তীব্র অপছন্দ করেন, যেখানে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে এই অনাস্থার হার মাত্র ৪৫ শতাংশ।
রাজনৈতিক আদর্শের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কট্টরপন্থী বামপন্থী বা লিবারেল ভাবধারার মানুষেরা ডানপন্থীদের চেয়ে ইসরায়েলের প্রতি অনেক বেশি ক্ষুব্ধ এবং এই আদর্শিক ব্যবধান সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ৮৩ শতাংশ লিবারেল বা উদারপন্থী নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, অথচ কনজারভেটিভ বা অনুদারপন্থীদের মধ্যে এই হার মাত্র ৩৭ শতাংশ।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন এবং সুইডেনে বামপন্থী মতাদর্শের প্রায় ৯০ শতাংশ বা তার বেশি মানুষ ইসরায়েলকে নেতিবাচক চোখে দেখেন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তুলনামূলক ডেটা থাকা ২৪টি দেশের মধ্যে ১৩টি দেশেই গত ২০১৫ সালের তুলনায় ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে; যেমন আর্জেন্টিনায় গত বছর যেখানে ৪৬ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন, এবার তা বেড়ে ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া, পোল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যেও ইসরায়েলের ওপর মানুষের ক্ষোভ আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে।
এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ওপর থেকে বিশ্ববাসীর আস্থা প্রায় সম্পূর্ণ উঠে গেছে। অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, স্পেন, সুইডেন, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য এবং ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে বিশ্ব রাজনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর ওপর তাদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই।
জরিপভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র কেনিয়া এবং ফিলিপাইনে অর্ধেকের বেশি মানুষ নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রতি কিছুটা আস্থা দেখিয়েছেন। নেতানিয়াহুর প্রতি এই অনাস্থা গত বছরের তুলনায় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ কোয়ারিয়ায় এই অনাস্থার হার গত বছরের ৬৪ শতাংশ থেকে বেড়ে এবার ৭৬ শতাংশে এবং ইতালিতে গত বছরের ৪৫ শতাংশ থেকে লাফিয়ে এক লাফে ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে।
সময়ের আলো/টিএইচ