বিশ্বের ৩৬টি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। সেই সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর তাদের আস্থা ‘খুব সামান্য’ কিংবা ‘একেবারেই নেই’ বলেও জানান। তবে কেবল ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে ইসরাইলপ্রীতি দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত এই জরিপ চালানো হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পরই মূলত জরিপসংক্রান্ত অধিকাংশ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল।
জরিপের আওতাভুক্ত দেশগুলোর গড়ে ৬৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচক বা প্রতিকূল মনোভাব দেখিয়েছেন। বিপরীতে মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষের মনোভাব ছিল ইতিবাচক। জরিপ করা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বা অঞ্চলগুলোয় ইসরাইলের প্রতি এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে তীব্র। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম রয়েছে। (তবে গাজা উপত্যকায় কোনো জরিপ চালানো সম্ভব হয়নি।)
জরিপের আওতায় থাকা ইউরোপের সব কটি দেশের মানুষই ইসরাইল সম্পর্কে তুলনামূলক নেতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন। বিশেষ করে ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের প্রায় অর্ধেক বা এর বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানিয়েছেন, ইসরাইলের প্রতি তাদের ‘অত্যন্ত নেতিবাচক’ মনোভাব রয়েছে। জরিপ করা সাব সাহারা অঞ্চলের কিছু আফ্রিকান দেশে ইসরাইলের প্রতি সবচেয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে।
উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের মধ্যে ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে, হাঙ্গেরিতে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সি তরুণদের ৭২ শতাংশেরই ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। বিপরীতে ৫০ বছর বা এর বেশি বয়সিদের মধ্যে এই হার ৪৫ শতাংশ।
অনেক দেশেই রাজনৈতিকভাবে বামপন্থি ও ডানপন্থি মতাদর্শের মানুষের মধ্যে ইসরাইল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির বিশাল ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির ৮৩ শতাংশ উদারপন্থি ও ৩৭ শতাংশ রক্ষণশীল মানুষের চোখে ইসরাইল একটি নেতিবাচক দেশ। অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও সুইডেনে বামপন্থিদের প্রতি ১০ জনের প্রায় ৯ জন বা এরচেয়ে বেশি মানুষের মনোভাব ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচক। দেশগুলোর প্রতিটিতেই বামপন্থিদের এই হার ডানপন্থিদের তুলনায় অন্তত ২৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
জরিপ করা প্রায় প্রতিটি উচ্চ আয়ের দেশেই রাজনৈতিক আদর্শের এমন ছোট, কিন্তু ধারাবাহিক ব্যবধান দেখা গেছে। সবখানেই ডানপন্থিদের তুলনায় বামপন্থিরা ইসরাইল সম্পর্কে বেশি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তবে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এমন ধারাবাহিক চিত্র দেখা যায়নি।
গত বছরও (২০২৫) ইসরাইলের প্রতি সাধারণ মানুষের মনোভাব বেশ নেতিবাচক ছিল। তবে পিউ রিসার্চ সেন্টারের কাছে আগের তথ্য রয়েছে, এমন ২৪টি দেশের মধ্যে ১৩টিতেই ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব এখন আরও বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে, আর্জেন্টিনায় ২০২৫ সালে ৪৬ শতাংশ মানুষ ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন। বর্তমানে তা বেড়ে ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠে রূপ নিয়েছে।
একইভাবে অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া, পোল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে ইসরাইলের প্রতি ‘অত্যন্ত নেতিবাচক’ মনোভাব রাখার হার দুই অঙ্কের ঘরে (১০ শতাংশ বা এর বেশি) বেড়েছে। জরিপ করা দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র গ্রিসেই গত বছরের তুলনায় ইসরাইলের প্রতি মনোভাব কিছুটা ইতিবাচক বা উষ্ণ হয়েছে। তবে এ পরিবর্তনের পরও দেশটির মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে ইসরাইল সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছেন।
জরিপ করা অধিকাংশ দেশের বেশিরভাগ মানুষই জানিয়েছেন, বৈশ্বিক বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর তাদের ‘খুব একটা বা একেবারেই’ আস্থা নেই। এসব দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, স্পেন, সুইডেন, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও (ফিলিস্তিনের) পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম রয়েছে।
জরিপে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর অর্ধেক বা এর চেয়ে বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর ওপর তাদের ‘একবিন্দুও আস্থা নেই’। দেশগুলোর মধ্যে শুধু কেনিয়া ও ফিলিপাইনে অর্ধেকের বেশি মানুষ নেতানিয়াহুর প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন। ইসরাইল সম্পর্কে মনোভাবের মতো নেতানিয়াহুর ওপর আস্থার ক্ষেত্রেও বয়স ও রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য দেখা গেছে। তরুণ ও বামপন্থিরা প্রায়ই বয়স্ক ও ডানপন্থিদের তুলনায় তার ওপর কম আস্থা দেখিয়েছেন।
উদাহরণ হিসেবে, হাঙ্গেরিতে ৫০ বছর বা এর বেশি বয়সিদের তুলনায় ৩৫ বছরের কম বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ইসরাইলি নেতার প্রতি ‘খুব কম বা কোনো আস্থা নেই’ বলার প্রবণতা ২৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। আবার অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে বামপন্থিদের মধ্যে নেতানিয়াহুর ওপর ‘একবিন্দু আস্থা নেই’ বলার হার ডানপন্থিদের তুলনায় অন্তত ২৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। রাজনৈতিক আদর্শগত এ ব্যবধান যথারীতি যুক্তরাষ্ট্রেই সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের মধ্যে ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, হাঙ্গেরিতে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সি তরুণদের ৭২ শতাংশেরই ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পিউ রিসার্চ সেন্টারের কাছে আগের তথ্য রয়েছে, এমন ২৪টি দেশের ১৩টিতেই ২০২৫ সালের তুলনায় নেতানিয়াহুর ওপর মানুষের আস্থা কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। দক্ষিণ কোরিয়ার ৭৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখন বলেছেন, বিশ্বরাজনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর ওপর তাদের ‘খুব একটা বা একেবারেই’ আস্থা নেই। গত বছর এই হার ছিল ৬৪ শতাংশ।
গত বছর একই প্রশ্ন করা হয়েছিল, এমন দেশগুলোর প্রায় অর্ধেকেই নেতানিয়াহুর ওপর ‘একবিন্দু আস্থা নেই’ বলা মানুষের হার দুই অঙ্কের ঘরে (১০ শতাংশ বা এর বেশি) বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইতালিতে ২০২৫ সালে ৪৫ শতাংশ মানুষ এমন মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে।
৩৬টি দেশের ৪৪ হাজার ৬৫৭ জনের ওপর এ জরিপ পরিচালিত হয়েছে। তবে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো ভারত। জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে ভারতে মাত্র ২৮ শতাংশ মানুষ ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, আর ৩২ শতাংশ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে জরিপে অংশ নেওয়া সব দেশের মধ্যে ভারতেই ইসরাইলের প্রতি সবচেয়ে কম নেতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। নেতানিয়াহুর প্রতি অনাস্থা প্রশ্নেও ভারত ব্যতিক্রমী অবস্থানে। দেশটির মাত্র ২৭ শতাংশ মানুষ নেতানিয়াহুর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন, আর ৩৪ শতাংশ আস্থা রাখেন বলে জানিয়েছেন।
আরবিএন