ইরান ও লেবাননে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার নীতিগত বিরোধ এবার এক নজিরবিহীন গোয়েন্দা দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। ওয়াশিংটনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন নীতি-নির্ধারণী তথ্য হাতিয়ে নিতে মিত্র রাষ্ট্র ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আমেরিকার ওপরই নজিরবিহীন নজরদারি শুরু করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই চরম গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কায় মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর ‘পেন্টাগন’ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের অভ্যন্তরীণ ‘কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স’ বা প্রতি-গোয়েন্দা সতর্কবার্তার মাত্রা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ স্তর তথা ‘ক্রিটিক্যাল’ বা ‘শঙ্কাজনক’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
মার্কিন প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম ‘এনবিসি নিউজ’ এবং ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ দেশটির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছে। পেন্টাগনের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত সাত পৃষ্ঠার একটি অতি গোপনীয় নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতা এখন আর সাধারণ দুটি বন্ধু রাষ্ট্রের পারস্পরিক তথ্যের আদান-প্রদানের পর্যায়ে নেই, বরং তা মারাত্মক ও আগ্রাসী গুপ্তচরবৃত্তির রূপ ধারণ করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা পর্যালোচনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে- ইরানের সাথে শান্তি আলোচনা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে নিয়োজিত শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলি সংস্থাগুলো তাদের নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই তালিকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, পেন্টাগনের নীতি-নির্ধারক প্রধান এলব্রিজ কোলবি এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাইকেল ডিমিনোর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা রয়েছেন, যাদের ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু (টার্গেট) বানিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইসরায়েলের এই অতি-আগ্রাসী গোয়েন্দা তৎপরতাকে সরাসরি ‘উন্মত্ত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এছাড়া ইসরায়েলে কর্মরত মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে এবং মার্কিন স্থাপনাগুলোতে গোপনে আড়ি পাতার ও তথ্য চুরির সুবিধাজনক ক্ষতিকারক সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যারের সন্ধান মিলেছে, যা ওয়াশিংটনকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান এই সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সতর্কতা কূটনৈতিক মহলে ১৯৮৫ সালের সেই কুখ্যাত ‘জোনাথন পোলার্ড’ কাণ্ডের কালো স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর তত্কালীন গোয়েন্দা বিশ্লেষক পোলার্ড ইসরায়েলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করার অপরাধে গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ ৩০ বছর মার্কিন কারাগারে বন্দি থাকেন। ওই ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ও কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আবারও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় পেন্টাগন তাদের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে সুরক্ষামূলক ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্বের কারণেই এই গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ট্রাম্প যেখানে ইরানের সাথে একটি ব্যাপকভিত্তিক কূটনৈতিক শান্তি চুক্তি এবং যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করছেন, সেখানে নেতানিয়াহু সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা না করে ইরানের ওপর আরও বিধ্বংসী সামরিক হামলা এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অনড়। সম্প্রতি লেবানন ইস্যু নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ফোনে এক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ও হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কে ফাটলের ইঙ্গিত দেয়।
/কহু