চীনের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নির্ধারণের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে পরিচিত বাৎসরিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ‘গাওকাও’ শুরু হয়েছে। রোববার (৭ জুন) রাজধানী বেইজিংসহ সমগ্র চীনজুড়ে একযোগে এই বহু-দিনব্যাপী ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষা শুরু হয়। চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশজুড়ে রেকর্ড ১ কোটি ২৯ লাখ শিক্ষার্থী এই ভাগ্য নির্ধারণী পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছে।
গলফ নিউজে বলা হয়, রোববার সকালে বেইজিংয়ের নীল আকাশের নিচে বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে দেখা যায় এক আবেগঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ। হাতে কলম আর প্রবেশপত্র (আইডি) নিয়ে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী যখন কেন্দ্রে প্রবেশ করছিল, তখন বাইরে তাদের ঘিরে ছিলেন উদ্বিগ্ন ও আশাবাদী অভিভাবকেরা। চীনা সংস্কৃতিতে লাল রঙকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করা হয়; তাই অনেক মা-বাবাকেই এদিন লাল রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে সন্তানদের শুভকামনা জানাতে দেখা যায়। পরীক্ষা কেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষীদের বিপুল সদস্য মোতায়েন করা ছিল।
চীনের শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘গাওকাও’ পরীক্ষাকে ধরা হয় পৃথিবীর অন্যতম কঠিন এবং মানসিক চাপযুক্ত পরীক্ষা হিসেবে। কয়েক দিন ধরে চলা এই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মূলত চীনা ভাষা, গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান এবং মানবিক শাখার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গভীর মূল্যায়ন করা হয়। চলতি মাসের শেষ দিকেই এই পরীক্ষার ফল প্রকাশ করার কথা রয়েছে।
বেইজিংয়ের এক পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে ইউনিফর্ম পরিহিত ১৮ বছর বয়সী পরীক্ষার্থী ঝাং শিননান ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘পরীক্ষা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তো আছেই, বিশেষ করে চীনা ভাষার রচনা অংশটি নিয়ে। কারণ ইদানীং রচনার বিষয়গুলো বেশ জটিল ও কঠিন হচ্ছে। তবে গত এক বছর আমি হাড়ভাঙা খাটুনি ও অনুশীলন করেছি। আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভেতরে যাচ্ছি, আশা করি ভালো কিছুই হবে।’ নতুন প্রজন্মের এই শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব ‘নিও এনার্জি ভেহিকল’ বা বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখছে।
বিগত কয়েক দশকে চীনের অভাবনীয় অর্থনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে দেশটির উচ্চশিক্ষার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনই সন্তানদের ক্যারিয়ার নিয়ে অভিভাবকদের প্রত্যাশাও আকাশ ছুঁয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের শ্রমবাজার ও চাকরির ক্ষেত্র আগের মতো মসৃণ নয়। বিশেষ করে দেশটির তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উচ্চ বেকারত্বের হার এখন একটি বড় জাতীয় উদ্বেগ। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, চীনে বর্তমানে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের (শিক্ষার্থী বাদে) প্রতি ৬ জনের মধ্যে ১ জনই বেকার।
চাকরির বাজারের এই মন্দা এবং তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এখন ‘গাওকাও’ পরীক্ষা নিয়ে চীনের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের সনাতন মানসিকতায় এক বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভালো ফলের জন্য সন্তানদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য বিসর্জন দিতে এখন আর অনেক অভিভাবকই রাজি নন।
পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে মেয়ের জন্য পড়ার বই হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ৫৩ বছর বয়সী মা ডেং জু বলেন, ‘আমি আমার সন্তানকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি। সে তার স্বাভাবিক মেধা অনুযায়ী পরীক্ষা দিক, এটাই যথেষ্ট। নামী-দামী সিংহুয়া বা পিকিং ইউনিভার্সিটিতেই পড়তে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমার কাছে মেয়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যই সবার আগে, পরীক্ষা তো কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।’ হাস্যোজ্জ্বল মুখে এই অভিভাবক আরও যোগ করেন, ‘যদি আমার হাতে থাকত, তবে আমি এই ‘গাওকাও’ প্রথাই বাতিল করে দিতাম। কিন্তু বাস্তবতায় তা তো আর সম্ভব নয়!’
/কহু