আমের জেলা হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা নওগাঁ। রফতানিযোগ্য এবং কীটনাশকমুক্ত আম উৎপাদন ও ভাল দাম পেতে ফ্রুট ব্যাগিং করেন চাষিরা। তবে এ বছর চাহিদামতো ফ্রুট ব্যাগ না পাওয়ায় আমে ব্যাগিং করতে পারেননি চাষিরা। আবার যতটুকু ফ্রুট ব্যাগ পাওয়া গেছে দ্বিগুণ দামে কিনতে হয়েছে। প্রতিটি ফ্রুট ব্যাগ ৩ টাকা ৭০ পয়সা হলেও এ বছর ৬ টাকা ২০ পয়সায় কিনতে হয়েছে চাষীদের। বাড়তি দাম দিয়েও চাহিদামতো পাওয়া যায়নি। এতে আমের কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়েছে তাদের। সেইসঙ্গে আয়ের একটি অংশ থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে আমচাষীদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। যা থেকে প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৬ হেক্টর জমিতে আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগো ও গৌড়মতি ১ কোটি ১১ লাখ ৫১ হাজার ৫০০ পিস আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়েছে। গত বছর সাপাহার ও পোরশা উপজেলা থেকে বিভিন্ন রফতানিকারকের মাধ্যমে ২৮৪ টন আম্রপালি, খিরসাপাত ও ব্যানানা ম্যাংগো আম মধ্যপাচ্য ও ইউরোপে রফতানি হয়েছিল।
বরেন্দ্র ভূমি হিসেবে পরিচিত নওগাঁর সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলা উপজেলার আংশিক এলাকা। জেলায় যে পরিমাণ আম বাগান রয়েছে তার ৭০ শতাংশ রয়েছে এসব উপজেলায়। যেখানে আম্রপালি, গোপালভোগ, খিরসাপাত, হিমসাগর ও বারী-৪ সহ প্রায় ১৬ জাতের আম উৎপাদন হয়। গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন জাতের আম। পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছে চাষীরা।
রফতানিযোগ্য এবং কীটনাশকমুক্ত আম উৎপাদন ও ভাল দাম পেতে ফ্রুট ব্যাগিং করেন চাষীরা। এপ্রিল মাস থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগো ও গৌড়মতি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করার সময়। এ বছর ফ্রুট ব্যাগ না পাওয়ায় অনেক চাষী আমে ব্যাগিং করতে পারেননি। খোলা আম বাজারে সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা মন দরে বিক্রি হয়ে থাকে। তবে ফ্রুট ব্যাগিং করা আম ক্রেতাদের কাছে চাহিদা থাকায় বাজারে প্রকারভেদে ৭-৮ হাজার টাকা মন দরে বিক্রি হয়ে থাকে
চাষীরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর আমের ফলন ভাল হয়েছে। নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় কমেছে রোগাবালাই। তবে রোগাবালাই নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক স্প্রেসহ পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে চাষীরা সরাসরি আম রফতানি করেন না। বাধ্য হয়ে আমদানিকারকদের কাছে বিক্রি করতে হয়। রফতানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা হলে অর্থনীতিতে এগিয়ে যাবে এ জেলা।
ফ্রুট ব্যাগ স্বল্পতার কারণ হিসেবে আম চাষীরা বলছেন, গত ৩-৪ বছর আগে যেসব গাছ রোপণ করা হয়েছিল সেসব গাছে এবার আম এসেছে। এতে ফলজ বাগানের পরিমাণ বেড়েছে। চাষিরাও আমের যত্ন হিসেবে ফ্রুট ব্যাগিং করছে। এসব কারণে চাষীদের কাছে ফ্রুট ব্যাগের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে এবং বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে।
জেলার পোরশা উপজেলার বন্ধুপাড়ার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা রায়হান আলম বলেন, ২২০ বিঘা জমিতে আম্রপালি, গৌঢ়মতি ও বারি-৪ সহ বিভিন্ন জাতের আম বাগান রয়েছে। গ্যাপ পদ্ধতি অনুসরণ করে রফতানিযোগ্য এবং কীটনাশকমুক্ত ও নিরাপদ আম উৎপাদনে এ বছর ৬০ বিঘা জমির ৫ লাখ পিস আমে ফ্রুট ব্যাগিং করার আশা ছিলো। চাহিদামতো ও সময়মতো ফ্রুট ব্যাগ না পাওয়ায় আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগো ও বারি-৪ আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে লেট ভ্যারাইটি গৌড়মতি সাড়ে ৪ লাখ পিস আমে ফ্রুট ব্যাগিং করতে হয়েছে। প্রতিটি ফ্রুট ব্যাগ কিনতে হয়েছে ৩ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৬ টাকা ২০ পয়সায়। বেশি দাম দিয়ে ফ্রুট ব্যাগ কিনতে হয়েছে। ফ্রুট ব্যাগিং করলে ভাল দাম পেয়ে লাভবান হওয়া যায়। এ বছর তা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
একই উপজেলার সাদের ডাঙা গ্রামের আম চাষী বাবুল আক্তার বলেন, আমে ফ্রুট ব্যাগিং করে ভাল দাম পেয়েছিলাম। সে আশা থেকে এ বছর ৫০ হাজার পিস আমে ফ্রুট ব্যাগিং করার ইচ্ছা থাকলে ব্যাগিং করতে পেরেছি গৌড়মতি মাত্র ১০ হাজার পিস আমে। গত বছর এসিআই কোম্পানির ফ্রুট ব্যাগ কিনেছিলাম মাত্র ৩ টাকা ৮০ পয়সায়। এ বছর ওই কোম্পানির ফ্রুট ব্যাগ প্রতিপিস ৬ টাকা ২০ পয়সায় কিনতে হয়েছে। আমে ফ্রুট ব্যাগিং করতে না পেরে পোকার উপদ্রব বেড়েছে। চাহিদামতো এবং স্বল্প দামে সরবরাহের দাবি জানাই।
সাপাহার উপজেলা বরেন্দ্র অ্যাগ্রো উদ্যোক্তা সোহেল রানা বলেন, এ বছর ফ্রুট ব্যাগের চাহিদা ছিলো ৩ লাখ পিস। এর বিপরীতে মাত্র ১৫ হাজার পিস কিনতে পেরেছি। তাও আবার চড়া দামে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল বলেন, রফতানিযোগ্য আমের জন্য মূল বিষয় হচ্ছে ফ্রুট ব্যাগ। কৃষকদের মাঝে উত্তম কৃষি চর্চার মাধ্যমে আম উৎপাদনের আগ্রহ বাড়েছে। এ কারণে রফতানির পরিসর বাড়াতে কীটনাশকমুক্ত আম উৎপাদন ও ভাল দাম পেতে কৃষকদের মাঝে ফ্রুট ব্যাগের চাহিদা বেড়েছে। শেষ সময়ে এসে আমচাষীদের কাছে ফ্রুট ব্যাগের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় যেসব কোম্পানি ফ্রুট ব্যাগ সরবরাহ করে তারা দিতে পারেননি। তবে ফ্রুট ব্যাগ সরবরাহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে চাহিদামতো ব্যাগ সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সময়ের আলো/জোই