১৯৫৪ সালে বিশ্বকাপের আসর বসেছিল সুইজারল্যান্ডে। আজ থেকে ৭২ বছর আগের সেই আসরে ঘটেছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা। সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল সে সময়ের অন্যতম সেরা দুই দল হাঙ্গেরি ও ব্রাজিল। কিন্তু মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে ম্যাচটি ইতিহাসে জায়গা করে নেয় ‘ব্যাটল অব বার্ন’ নামে। সেই ম্যাচের খেলোয়াড়রা মেতে উঠেছিলেন লাথি, ঘুষি আর হাতাহাতির মতো এক কুৎসিত লড়াইয়ে।
সে সময় পুসকাস-কচিশদের হাঙ্গেরিকে বলা হতো ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স, যারা অপরাজেয় দল হিসেবে বিশ্বকাপে এসেছিল। অন্যদিকে লাতিন পরাশক্তি ব্রাজিলও ছিল দুর্দান্ত। উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে হাঙ্গেরি যখন ৪-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে সেমিফাইনালে পা রাখে, তখনই ঘটে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
হাঙ্গেরির জয়ের আনন্দের মাঝেই পরাজয় মেনে নিতে না পেরে মাঠে এবং মাঠের বাইরে হাঙ্গেরিয়ান খেলোয়াড়দের ওপর চড়াও হন ব্রাজিলীয় ফুটবলাররা।
মাঠের উত্তেজনা ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর রূপ নেয় প্রকাশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে। দুই দলের খেলোয়াড়, কোচ এবং অফিশিয়ালরা একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। হাঙ্গেরির ফুটবল কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাস চোটের কারণে সেই ম্যাচে খেলেননি, তিনি গ্যালারিতে ছিলেন। কিন্তু ম্যাচ শেষে টানেলের ভেতর ব্রাজিলীয় ডিফেন্ডার পিনহেইরোকে লক্ষ্য করে তিনি একটি বোতল ছুঁড়ে মারেন, যা পিনহেইরোর মুখে গিয়ে লাগে।
এরপর ড্রেসিংরুমের করিডোরে দুই দলের মধ্যে ব্যাপক মারামারি শুরু হয়। বুট, পানির বোতল, ভাঙা কাচ এবং জুতো ছুড়ে একে অপরকে রক্তাক্ত করে ফেলেন তারা। হাঙ্গেরির তৎকালীন কোচ গুস্তভ সেবেস মাথায় চার ইঞ্চি গভীর ক্ষত নিয়ে মাঠ ছাড়েন, যা মূলত ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের জুতো ও বোতলের আঘাতে হয়েছিল।
সেই ম্যাচটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ইংরেজ রেফারি আর্থার এলিস। মাঠে তিনি তিনটি লাল কার্ড (ব্রাজিলের দুই জন ও হাঙ্গেরির এক জন) দেখিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি।
ম্যাচ শেষে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমি ভেবেছিলাম এটি আমার জীবনের সেরা একটি ম্যাচ হবে। কিন্তু এটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না, এটি যেন কোনো ফুটবল ম্যাচ ছিল, ছিল এক যুদ্ধক্ষেত্র।
তৎকালীন ফিফা কর্তৃপক্ষ এই নজিরবিহীন সহিংসতার পরও কোনো খেলোয়াড় বা দলের বিরুদ্ধে বড় কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের কাছে ‘ব্যাটল অফ বার্ন’ আজও ফুটবলের সুন্দর অবয়বে এক কুৎসিত কালো অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
সময়ের আলো/আআ