সম্প্রতি পাবনা মানসিক হাসপাতালে আবাসিক ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া ২ রোগীর মধ্যে মারামারির ঘটনায় ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) এ ঘটনা ঘটে। এতে নিহতের পরিবার অভিযুক্তের নামসহ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, মানসিক হাসপাতালের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। সুস্থতার আশায় স্বজনকে হাসপাতালে পাঠিয়ে একজন লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। অন্য অভিযুক্ত মানসিক রোগী হয়েছেন হত্যা মামলার আসামি। এই মর্মান্তিক ঘটনায় কর্তৃপক্ষ জনবল সংকটকে দায়ী করলেও, প্রশ্ন উঠেছে তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের আঙিনায় শ্বশুর-শাশুড়ি ও ১৩ মাসের ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে এভাবেই উদভ্রান্তের মতো ঘুরছেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া গ্রামের বিলকিস খাতুন। মানসিক সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত স্বামী নাজমুলকে গত ২ জুন হাসপাতালের আবাসিক ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। অসুস্থ স্বামীর সুস্থতার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরলেও, পরদিন ভোরেই খবর পান তার স্বামী আবাসিক ওয়াডে ভর্তি হওয়া অন্য একজনকে আঘাত করে মেরে ফেলেছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২ জুন রাত ৩ টার দিকে নাজমুলের মানসিক অসুস্থতা তীব্র আকার ধারণ করলে, একই ওয়ার্ডের ইনজামুল নামের অন্য এক রোগীকে আক্রমণ করেন তিনি। দুজনের মারামারির একপর্যায়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান ইনজামুল। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন নাজমুলও। এমন ঘটনার পর হাসপাতালে স্পর্শকাতর রোগীদের নিরাপত্তা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। অভিযোগ উঠেছে, নাজমুলকে সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো নির্যাতন করেছে হাসপাতালের কর্মীরা।
অভিযুক্ত মানসিক রোগী নাজমুলের স্ত্রী বিলকিস খাতুন বলেন, ‘ঘটনার সময় সেখানে যারা দায়িত্ব পালন করছিল, তারা সেটা ঠেকাতে পারেনি কেন? ঘটনার পরে আমার স্বামীকে তারা প্রচণ্ড মেরেছে। একজন মানসিক অসুস্থ মানুষকে কী মারা যায়? পরদিন তারা আমাকে রোগী নিয়ে যেতে বলেছে। ছাড়পত্র দিয়ে, আবার নিয়ে নিয়েছে। এরপর পুনরায় ভর্তির টাকা চেয়েছে। আমি গরীব মানুষ, টাকা কোথায় পাব। আমরা রোগীকে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছি। তাকে চরম মেরেছে সবাই মিলে। এখন তার নামে হত্যার অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার। আমরা খুব বিপদের মধ্যে পড়েছি। প্রতিদিন ঘুরছি, কিন্তু তারা আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে দিচ্ছে না। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে নেওয়া দরকার। আমার স্বামীকে আমাদের কাছে বুঝিয়ে দিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, এটাই আমাদের দাবি।’
অভিযুক্ত মানসিক রোগী নাজমুলের বাবা আব্দুল মালেক বলেন, ‘ছেলে অসুস্থ। তার ছোট সন্তান আছে। এমন অবস্থায় আমরা বিপদের মধ্যে আছি। মানসিক রোগীর নামে কী মামলা হয়? যারা রাতে দায়িত্ব পালন করছিল, তাদের গাফিলতিতে এ ঘটনা হয়েছে। আমাদের রোগী এখানে রাখা নিরাপদ মনে করছি না।’
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নাজমুলকে অভিযুক্ত করে নিহত ইনজামুলের ভাই পাবনা সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। তবে মামলার বাদী বলছেন, নাজমুল নয়, রোগীর নিরাপত্তায় চরম গাফিলতি ও ব্যর্থতার দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই।
দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি ছিল না দাবি করে, উল্টো জনবল সংকটকে দায়ী করছেন সেবাকর্মী ও চিকিৎসকরা।
অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের আইসোলেশনে রাখার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটি স্বীকার করে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই কম লোকবল নিয়ে চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম। সামনে নানা সুযোগ সুবিধা নিয়ে আধুনিকায়ন হবে এই হাসপাতাল। তখন হয়ত আরও উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যদিকে, মানসিক রোগীদের বিষয়ে আইনগত ঝামেলা রয়েছে। তারা তদন্ত কাজ করছে। তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
সেদিনে ঘটনায় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ড ইনচার্জ সুব্রত কুমার রায় বলেন, ‘নতুন যারা ভর্তি হন, তাদেরকে একটি ওয়ার্ডে রাখা হয় এটাই নিয়ম। এ ধরনের রোগী কখন উত্তেজিত হয়ে পড়বে, তা বলা যায় না। আমরা সতর্ক থাকি। ওই ওয়ার্ডে ১২ জন রোগী। মধ্যরাতে ২ জনের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। আমরা দায়িত্ব পালন করছিলাম দুইজন। তবু সবাই মিলে চেষ্টা করি। কিন্তু দেয়ালে মাথা লাগায় মৃত্যু হয় ১ জনের। ঘটনাটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে জানানো হয়। অন্য মানসিক রোগীরা অভিযুক্তকে মেরেছে। বর্তমানে তাকে মেডিসিন দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।’
পাবনা মানসিক হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক রেখা আক্তার বলেন, ‘জনবল সংকট রয়েছে। ১ জন মানসিক রোগীর জন্য দরকার ৩ জন। সেখানে ১ জনও নাই। পুরুষ ওয়ার্ডে পুরুষ দিয়ে, নারী ওয়ার্ডে নারী দিয়ে দায়িত্ব পালন করানো দরকার। এখানে সংকট নিয়েই আমরা দায়িত্ব পালন করছি। দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা করার সুযোগ নেই।’
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে কাজ করছে পুলিশ। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানসিক রোগীর মানসিক অসুস্থতা ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা যাচাই করে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনুর রহমান।
মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে মারামারি ও আত্মহত্যায় প্রায়শই রোগী মৃত্যুর ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ সামগ্রিক সেবা পদ্ধতি। স্পর্শকাতর ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের প্রাণহানি এড়াতে কর্তৃপক্ষ আরও দায়িত্বশীল হবেন এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষের।
/মহু