দিনের আলোয় ব্যস্ততা, রাত নামলেই নীরবতা— পুরান ঢাকার বংশালের অলিগলিতে অপরাধের নানা অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বংশাল, সিক্কাটুলী, নয়াবাজার ও আশপাশের এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহড়া, ইভটিজিং, মাদক কারবার, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়িত।
বংশালের বিভিন্ন গলিতে ইয়াবা, গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদকের কারবার চলছে। পুলিশ ও ডিবি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক উদ্ধার ও কারবারিদের গ্রেফতার করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল হোতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। কিশোর ও যুবকদের একটি অংশকে মাদক পরিবহন ও বিক্রিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বংশাল দেশের অন্যতম বড় জুতা, হার্ডওয়্যার ও সাইকেল পার্টসের বাণিজ্যিক এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুটপাথ, দোকান, গুদাম ও মালামাল লোড-আনলোডের পয়েন্ট থেকে দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করা হয়। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
সরু গলিতে রাত ও ভোরে রিকশা আরোহী ও পথচারীদের আটকে টাকা-মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া এবং দোকান-গুদামের তালা কেটে মালামাল চুরির ঘটনাও ঘটে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, টাকা-পয়সার লেনদেন ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মারামারি এবং হত্যার ঘটনাও ঘটছে।
চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বংশালে অভিযান চালিয়ে ১০৫টি চোরাই বাইসাইকেল উদ্ধার এবং ছয়জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২৯ মার্চ এক ছিনতাইকারীকে সুইচ গিয়ারসহ গ্রেফতার করা হয়। এপ্রিলের শুরুতে ফ্ল্যাটে চুরির ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করে চুরি যাওয়া টাকা ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়।
১২ মে বাঘডাশা লেনের একটি বাসা থেকে ব্যবসায়ী নিসার আলীর (৫০) হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পাঁচ দিন পর ১৭ মে নিজ বাসা থেকে ব্যবসায়ী তৌশিক আহামেদের (২৬) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ২৫ জুন সিদ্দিক বাজারের একটি আবাসিক হোটেল থেকে শামিম হাসনাতের (৪৬) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মাদকবিরোধী অভিযানেও বড় সাফল্যের দাবি করেছে পুলিশ। ১২ জুন তাঁতীবাজার মোড়ে অভিযান চালিয়ে ১৬ হাজার পিস ইয়াবাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে পৃথক অভিযানে ২ হাজার ৩১০ পিস ইয়াবাসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। সম্প্রতি তাসের মাধ্যমে জুয়া খেলার অভিযোগে ১৫ জনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দুই মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
অপরাধের পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ১০ জুলাই মুকিম বাজার রোডের শিয়া গলিতে মোটর পার্টসের দোকানে বিস্ফোরণের পর আগুনে দেলওয়ার হোসেন (৩৫) নিহত এবং নাজমুল হোসেন (৩৩) গুরুতর দগ্ধ হন। ১৪ জুলাই আলুবাজারের একটি সেলুনে এসি বিস্ফোরণে ১০ জন দগ্ধ হন। ঘনবসতি, সরু সড়ক এবং পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে অগ্নিকাণ্ডে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
এ ছাড়া ফুটপাথ দখল ও অবৈধ পার্কিংয়ে বংশালের যানজটও তীব্র। মালামাল লোড-আনলোডের কারণে সড়কের একাংশ প্রায়ই বন্ধ থাকে। এতে পথচারীদের মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয় এবং অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও যানজটে আটকে পড়ে।
বংশাল থানার ওসি এ. কে. এম. মাহফুজুল হক বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বিশেষ তল্লাশি ও চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সব ধরনের অপরাধ নির্মূলে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছে। থানার আওতায় কয়েকটি বড় মাদক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে।
পুলিশের দাবি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান নয়, অপরাধের মূলহোতাদের শনাক্ত, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দখল-চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে