ক্যাম্পে শৃঙ্খলা‌ মানছে না রোহিঙ্গারা

কায়সার হামিদ মানিক (উখিয়া)

সারাদেশ

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিয়ম না মানার প্রবণতা বাড়ার

2026-06-10T05:24:40+00:00
2026-06-10T05:24:40+00:00
 
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
সারাদেশ
ক্যাম্পে শৃঙ্খলা‌ মানছে না রোহিঙ্গারা
কায়সার হামিদ মানিক (উখিয়া)
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৫:২৪ এএম   (ভিজিট : ৯)
ছবি : সংগৃহীত
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। 

সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিয়ম না মানার প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি ক্যাম্পে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগ উঠেছে। রেশন বরাদ্দ কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অপরাধী চক্রের উসকানিতে এই অস্থিরতা দিন দিন আরও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, ক্যাম্পের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মানতে অনীহা দেখাচ্ছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। 

বিশেষ করে রেশন কার্ড আপডেট, ঘর মেরামত বা জরুরি সেবার টোকেন সংগ্রহের সময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায়ই তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা না পেয়ে তারা কর্মকর্তাদের হেনস্থা করার চেষ্টাও করছেন, যা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশৃঙ্খলার মূলে রেশন সংকট ও অসন্তোষ : বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ সহায়তা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সহায়তা তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ পাচ্ছেন মাসে ৭ ডলার, প্রায় ৩৩ শতাংশ পাচ্ছেন ১২ ডলার (বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩ ডলারসহ) এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে দেওয়া হচ্ছে ১০ ডলার করে। 
রোহিঙ্গা নেতা হাফিজুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। মানুষ যখন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে না, তখন তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়।

বেপরোয়া অপরাধী চক্র : টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া ২৬ নম্বর নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কমিউনিটি লিডার (মাঝি) আবুল কালাম বলেন, কিছু কিছু বেপরোয়া অপরাধীর কারণে ক্যাম্পে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তারা কারও কথা শুনতে চায় না। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেই যায়। 

তাদের বিচরণে দিন দিন পরিবেশ গুমোট হয়ে উঠছে। এমন অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করি। শান্তিতে বসবাস করতে চাই আমরা সাধারণ রোহিঙ্গারা। আশা করি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসন এগিয়ে আসবে।

অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্য : ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার সময় কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফের মানুষ মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আশ্রয়হীন রোহিঙ্গাদের জন্য নিজেদের খাবার ভাগ করে দেওয়া থেকে শুরু করে বাড়িঘরের আঙিনায় জায়গা করে দেওয়ার মতো সহমর্মিতার নজির গড়ে ওঠে তখন। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু রোহিঙ্গা চক্র অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নয়, ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারাও এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। 

টেকনাফ ও উখিয়ার মোট স্থানীয় জনসংখ্যা যেখানে প্রায় ৬ লাখ, সেখানে ৩৩টি ক্যাম্পসহ আশপাশ এলাকায় প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যার এই বৈষম্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রোহিঙ্গা শিবির ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা রয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা সদস্যদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কিছু ডাকাতদলের উপস্থিতির কথাও জানা যায়।

কাঁটাতারের বেড়া কেটে বাইরে যাতায়াত : রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া কেটে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যাতায়াতের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্যাম্পের বিভিন্ন অংশে বেআইনিভাবে দুই শতাধিক ছোট-বড় প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে অনেকেই নিয়ম ভেঙে ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অনিয়ন্ত্রিত পথ ব্যবহার করে কিছু রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং কেউ কেউ এলাকায় ঢুকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

পরিবেশ ও বনভূমি ধ্বংস : এদিকে রাতের আঁধারে বনের কাঠ কাটা এবং কর্মকর্তাদের বাধা প্রদান করা এখন রোহিঙ্গাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ও তাদের প্রায় বাকবিতণ্ডা হয়। 

থাইংখালী বনবিট কর্মকর্তা বলেন, ক্যাম্পসংলগ্ন বনাঞ্চলে রাতের আঁধারে কাঠ কাটার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। 

নিয়মিত টহল ও অভিযান চালিয়ে এসব কার্যক্রম ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও অনেক সময় দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়তে হয়। তিনি আরও জানান, অবৈধভাবে বনসম্পদ আহরণ বন্ধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক বর্তমান পরিস্থিতি স্থানীয় জনগণের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকটে স্থানীয়দের নিরাপত্তা, জীবিকা ও পরিবেশÑ সবকিছুই চাপে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। 

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা এবং টেকসই সমাধান হিসেবে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (এডিআইজি) মোহাম্মদ কাউছার সিকদার বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অধিকাংশ সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করেই ঘটে।

এসব বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এপিবিএন সদস্যরা সার্বক্ষণিক সজাগ থেকে দায়িত্ব পালন করছেন এবং যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রেশন বিতরণসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

পাশাপাশি ক্যাম্পে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে, যাতে রোহিঙ্গারা নিয়ম মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ হয়। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের টেকসই সমাধান হচ্ছে নিরাপদ প্রত্যাবাসন। এ লক্ষ্যে সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

/এসএকে


  বিষয়:   ক্যাম্প  শৃঙ্খলা‌  রোহিঙ্গা  কক্সবাজার  টেকনাফ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: