চট্টগ্রামে ফের পাহাড় ধসের আতঙ্ক

সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম

সারাদেশ

কয়েক দিন পরেই শুরু হচ্ছে বর্ষা মৌসুম। বর্ষা ঘনিয়ে আসায় নগরীতে পাহাড় ধসের আতঙ্ক তাড়া করছে। নগরীর অভ্যন্তরে ছোট বড়

2026-06-10T06:22:11+00:00
2026-06-10T06:22:11+00:00
 
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
সারাদেশ
চট্টগ্রামে ফের পাহাড় ধসের আতঙ্ক
সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৬:২২ এএম   (ভিজিট : ৮)
ছবি : সংগৃহীত
কয়েক দিন পরেই শুরু হচ্ছে বর্ষা মৌসুম। বর্ষা ঘনিয়ে আসায় নগরীতে পাহাড় ধসের আতঙ্ক তাড়া করছে। নগরীর অভ্যন্তরে ছোট বড় পাহাড়ের পাদদেশে আছে ছয় হাজারের বেশি খুপরি ঘর। 

এসব ঘরে বাস করছে অন্তত সোয়া লাখ মানুষ। প্রতি বছর পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। মৃত্যু এড়াতে বর্ষার আগে শুরু হয় তোড়জোড়। বর্ষা মৌসুম শেষ হলেই সব তৎপরতা থেমে যায়। 

আবার বেড়ে যায় অবৈধ বসবাসকারীদের তৎপরতা। সরিয়ে নেওয়া পরিবারগুলো ফের চলে আসে পাহাড়ে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে। এভাবে ইঁদুরদৌড় খেলা চলছে প্রায় দুই দশক ধরে। গঠনমূলক কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় পাহাড় ধসে মৃত্যু ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। 

চট্টগ্রামের ৩৪টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বাস করছেন লক্ষাধিক মানুষ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কার্যালয়ের বিপরীত এলাকার পাহাড়েই খুপরি ঘরে আছে শত শত পরিবার। নগরীর অভ্যন্তরে রেলওয়ের মালিকানাধীন সাত পাহাড়ে আছে পাঁচ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা হয়েছে। 

তিন দশকের বেশি সময় ধরে এসব পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে বহু পরিবার। ছোট ছোট খুপরি ঘরে আছে বিদ্যুৎ লাইন পানির সংযোগ। নগরীর ফয়’স লেক এলাকার ঝিল পাহাড়ে বেশি বাস করছে মানুষ। সাড়ে চার হাজার পরিবার আছে শুধু ফয়’স লেক পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে। 

এর বাইরে মতিঝরনা ও বাটালি হিল এলাকায় বসবাস চার শতাধিক পরিবারের। লেক সিটি আবাসিক এলাকা-সংলগ্ন বিজয় নগর পাহাড়ে আছে ২৮৮টি পরিবার। ষোলশহর স্টেশন-সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ৭৪টি, নগরের জাকির হোসেন সড়কে পরিবেশ অধিদফতর সংলগ্ন পাহাড়ে অন্তত ৫০টি পরিবার বসবাস করছে।

জেলার বাইরে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন পাহাড়ে অবৈধ বসতি বেড়েই চলছে। হাটহাজারি, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, পটিয়া, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ির পাহাড়ের পাদদেশে বাস করছে শত শত পরিবার। 

সরেজমিন নগরীর টাইগার পাস ও লালখান বাজার এলাকার অংশ ঘুরে দেখা গেছে, ব্যস্ত সড়কের পাশে প্রশাসনের নাকের ডগায় শত শত খুপরি ঘর। বাস, টিন দিয়ে তৈরি এসব ঘরে আছে বৈদ্যুতিক সংযোগ। খুপরি ঘরগুলো দেখে মনে হবে পাহাড়ের সামান্য অংশ ধসে পড়লেই দুর্ঘটনা ঘটবে।

নগরীর টাইগারপাস হয়ে আমবাগান এলাকায় যাওয়ার পথেই চসিকের অস্থায়ী ভবন। আন্দরকিল্লা এলাকার পুরোনা ভবন নতুন করে তৈরির কাজ শুরু হওয়ায় অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ আছে চসিকের এই ভবনটি পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে।

 চসিক ভবনের তৃতীয় তলা থেকে দেখা যায়, ১০/১৫ হাত দূরত্বের মধ্যে বিশাল পাহাড়। অনেকটা চসিক ভবনের গা ঘেঁষেই। এই পাহাড়ের উপরের অংশ থেকে নিচের অংশ পর্যন্ত অসংখ্য ছোট ছোট খুপরি ঘর। সারাক্ষণ খুপরি ঘরের বাসিন্দারা স্বাচ্ছন্দ্যে আসা যাওয়া করছে। কোনো ধরনের বাধা বা নিষেধ নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাসিন্দারা জানান, প্রতি মাসে স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়মিত ভাড়া প্রদান করেই তারা খুপরি ঘরে আছেন। অনেক বাসায় বিদ্যুৎ পানি সংযোগও আছে। প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও ভাড়া উত্তোলনকারীরা ফের তাদের পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করার সুযোগ করে দেন। 

চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়গুলোতে প্রশাসনের শিথিল তৎপরতায় অবৈধভাবে বিপুল পরিবার বসবাস করছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান। 

তিনি বলেন, শুধু বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই প্রশাসন দৌড়ঝাঁপ করলে হবে না। অবৈধ খুপরি ঘরগুলো পাহাড় কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নিতে হবে। এতে বর্ষায় ভারী বর্ষণ হলেও আতঙ্ক বা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থাকবে না।
 
৩৬ সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক
২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যুর পর গঠন করা হয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) সদস্য সচিব করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির নাম দেওয়া হয়েছিল শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। পরে কমিটির নাম থেকে শক্তিশালী শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। 

এই কমিটি ৩৬টি সুপারিশ দিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল পাহাড়ে জরুরিভাবে বনায়ন, গাইডওয়াল নির্মাণ, নিষ্কাশন ড্রেন ও মজবুত সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, পাহাড়ের পানি ও বালু অপসারণের ব্যবস্থা করা, বসতি-স্থাপনাগুলো টেকসই করা, যত্রতত্র পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ি এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা নিষিদ্ধ করা, পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না দেওয়া, মতিঝরনা ও বাটালি হিলের পাদদেশে অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ করে পর্যটন স্পট করা, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করা এবং পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ অনেক সুপারিশ। কিন্তু কোনো সুপারিশ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ আছে।

তবে কমিটির কার্যক্রম চলমান আছে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে। কমিটির কার্যক্রমও চলমান আছে। আমরা বর্ষার আগেই সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছি। যাতে পাহাড় ধসে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। 

জেলা প্রশাসনের কাছে খুপরি ঘরের কোন তথ্য আছে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের কাছে একটা হিসাব থাকে। প্রতি বছর সেটা যাচাই-বাছাই করা হয়।

দুই দশকে ধ্বংস ৬০ শতাংশ পাহাড়
চট্টগ্রামে একে একে ধ্বংস করা হয়েছে বহু পাহাড়। সড়ক নির্মাণ, হাউজিং প্রকল্প, শিল্প কারখানাসহ নানা প্রয়োজনে কেটে ফেলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন পাড়াড়। স্বাধীনতার পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৮৮টি পাহাড় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এসব পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। এ সময় আংশিক কাটা হয়েছে ৯৫টি। এরপরের ১২ বছরে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। 

পরিবেশ ফোরামে থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বেশিরভাগ পাহাড় কাটা হয় পাহাড়তলী, খুলশী, বায়েজিদ, লালখান বাজার মতিঝরনা, ষোলশহর ও ফয়’স লেকে। ১৯৭৬ থেকে ৩২ বছরে চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের ৮৮টি পাহাড় সম্পূর্ণ এবং ৯৫টি আংশিক কেটে ফেলা হয়। সবচেয়ে বেশি ৭৪ শতাংশ কাটা হয় পাঁচলাইশে।

পরিবেশবিদ আলিউর রহমান বলেন, পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো পাহাড় কাটা ও পাহাড় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ করতে, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সভা, সমাবেশ, মিছিল, সংবাদ সম্মেলন করেছে। বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারে কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। তারপরও গত ২ যুগে এই অঞ্চলে ভূমিদস্যুরা প্রায় ৪০ শতাংশ এবং শহরে ৬০ শতাংশ পাহাড় কেটে ধ্বংস করে ফেলেছে। 

পাহাড় ধসে মৃত্যুর দুঃসহ স্মৃতি
২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টিতে ব্যাপক হারে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। ওই একদিনের টানা বৃষ্টিতে কাছিয়াঘোনা, ওয়ার্কশপঘোনা, কুসুমবাগ, মতিঝরনা এলাকায় পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ ১২৭ জন মারা যায়। 

গেল দুই দশকে পাহাড় ধসে মারা গেছে অন্তত ৩০০ জন। ২০০৭ সালে পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঘটনার পর গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। কমিটি নানা সুপারিশ করে। কিন্তু কোনো সুপারিশ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ঠেকানো যাচ্ছে না মৃত্যু। 

নগরীর ষোলশহর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইমতিয়াজ বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে ও পড়ে প্রশাসনিক তৎপরতা চোখে পড়ে। ভারী বৃষ্টির সময় দেখা যায় মাইকিং করতে। 

এরপর সারা বছর কার্যকর তৎপরতা বলতে কিছু চোখে পড়ে না। টানা বৃষ্টি হলে ভোরে শুনতে পাই পাহাড় ধসে মানুষ মারা গেছে। প্রশাসন ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে এত মৃত্যুর পর পাহাড়ে এবং পাহাড়ের পাদদেশে কেন খুপরি ঘর চোখে পড়বে। খুপরি ঘরগুলো উচ্ছেদ করে শূন্যে নামিয়ে আনতে সমস্যা কোথায়।

/এসএকে


  বিষয়:   চট্টগ্রাম  পাহাড়  ধস  আতঙ্ক 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: