তাজউদ্দীন থেকে আমির খসরু : কেমন ছিল অর্ধশতকের বাজেট ইতিহাস

সময়ের আলো ডেস্ক

অর্থনীতি

১৯৭২ সালে মাত্র ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার এক যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের পথচলা। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছরের

2026-06-11T09:15:21+00:00
2026-06-11T09:49:15+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
তাজউদ্দীন থেকে আমির খসরু : কেমন ছিল অর্ধশতকের বাজেট ইতিহাস
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৯:১৫ এএম  আপডেট: ১১.০৬.২০২৬ ৯:৪৯ এএম  (ভিজিট : ১৬)
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন। সংগৃহীত ছবি
১৯৭২ সালে মাত্র ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার এক যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের পথচলা। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছরের ব্যবধানে সেই বাংলাদেশ আজ এক অনন্য উচ্চতায় এসে দাঁড়িয়েছে।  

১১ জুন (বৃহস্পতিবার) জাতীয় সংসদে দেশের ৫৫তম বাজেট হিসেবে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট উপস্থাপন। 

এদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী, সংসদে উপস্থাপনের আগে বাজেটটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হবে এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এতে সম্মতি জানিয়ে সই করবেন। ১ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে নতুন এই অর্থবছর। 

এবারের বাজেটের মূল ভাবনায় রাখা হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা। ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’— এই সম্ভাব্য প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই অর্থমন্ত্রী আগামী এক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করবেন।

কেমন ছিল আগের বাজেট 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট দেওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭২ সালে তিনি ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের জন্য দেশের প্রথম বাজেট পেশ করেন। এর আকার ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি টাকা। প্রথম তিনটি বাজেটই ছিল তার হাত দিয়ে তৈরি। 

তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, এরও আগে ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্নে মুজিবনগর সরকার দৈনন্দিন ও অপরিহার্য ব্যয় নির্বাহের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট পেশ করেছিল।  

স্বাধীনতার পর থেকে এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এখন পর্যন্ত মোট ১৪ জন অর্থমন্ত্রী বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন মেয়াদে বাজেট পেশ করেছেন। ১১ জুন সংসদে বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী হবেন বাংলাদেশের বাজেট পেশকারী ১৫তম ব্যক্তি। 

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে উপস্থাপিত প্রথম বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ৫৫ বছরের ব্যবধানে দেশের বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ১,৩০৩ গুণ।  

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছিল, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম ছিল। 

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগের বছরের তুলনায় ছোট আকারের বাজেট উপস্থাপিত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এটি ছিল টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে মাহমুদ আলীর প্রথম বাজেট। 

এর আগে টানা পাঁচটি বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তার পূর্বসূরি প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত টানা ১০টি বাজেট উপস্থাপন করে একটি অনন্য রেকর্ড গড়েন। এর আগে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া টানা ছয়টি বাজেট পেশ করেছিলেন। 

তবে, মোট বাজেট উপস্থাপনের সংখ্যার বিবেচনায় আবুল মাল আবদুল মুহিত ও প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন। আবদুল মুহিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টানা ১০টি বাজেট ছাড়াও এরশাদ সরকারের সময়ে ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরের দুটি বাজেট পেশ করেছিলেন। 

ফলে তার উপস্থাপিত মোট বাজেটের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২টি। একইভাবে এম সাইফুর রহমানও বিভিন্ন মেয়াদে মোট ১২টি বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন, যা দেশের বাজেট ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড।


স্বাধীনতার পর বাজেটের পথচলা : এক নজরে বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাস

স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ওই অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ৭১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা পরে সংশোধন করে ৬৮৭ কোটি ৮০ লাখ টাকায় নির্ধারণ করা হয়।

পরবর্তী বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ব্যয় এবং রাজস্ব আহরণের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজেটের আকারও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ, ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, জিয়াউর রহমান, ড. এম এন হুদা, এম সাইফুর রহমান, আবুল মাল আবদুল মুহিত, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, আ হ ম মুস্তফা কামাল, আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং ড. সালেহউদ্দিন আহমেদসহ বিভিন্ন অর্থমন্ত্রী ও অর্থ উপদেষ্টা জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন।

সত্তরের দশকে বাজেটের আকার হাজার কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে। আশির দশকে তা কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যায় এবং নব্বইয়ের দশকে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। ২০০০ সালের পর বাজেটের প্রবৃদ্ধি আরও দ্রুত হয়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেটের আকার ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়; ওই বছরের প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা।

এরপর এক দশকের ব্যবধানে বাজেটের আকার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেট প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায় এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ লাখ কোটি টাকার ঘরে প্রবেশ করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দাঁড়ায় ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার বাড়িয়ে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট কিছুটা কমিয়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। একই সময়ে চলমান অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ১৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।

আয়-ব্যয় ও বাজেট ঘাটতির চিত্র

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বাজেটের বিপরীতে সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে মোট আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা নিট বাজেট ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হবে।

এই ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে আরও ১৫ হাজার কোটি টাকা।

প্রায় ৫৪ বছরের বাজেট ইতিহাসে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার কয়েকশ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এখন কয়েক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি দেশের অর্থনীতির সম্প্রসারণ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিস্তার এবং সরকারি ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।



/ইউএমএইচ


  বিষয়:   বাজেট  তাজউদ্দীন  আমির খসরু 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: