যেভাবে বাংলাদেশে এসেছিল ভ্যাট

সময়ের আলো ডেস্ক

অর্থনীতি

বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট চালুর ঘটনা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই করব্যবস্থা শুধু রাজস্ব সংগ্রহের

2026-06-11T09:47:55+00:00
2026-06-11T09:49:50+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
যেভাবে বাংলাদেশে এসেছিল ভ্যাট
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৯:৪৭ এএম  আপডেট: ১১.০৬.২০২৬ ৯:৪৯ এএম  (ভিজিট : ৩১)
করব্যবস্থা শুধু রাজস্ব সংগ্রহের ধরনই বদলায়নি, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট চালুর ঘটনা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই করব্যবস্থা শুধু রাজস্ব সংগ্রহের ধরনই বদলায়নি, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অন্যতম প্রধান রাজস্ব উৎস হলো ভ্যাট। সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে এ খাত থেকে। তবে এই ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল নানা বিতর্ক, ব্যবসায়ীদের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে।

ভ্যাট কী

মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট একটি পরোক্ষ কর। কোনো পণ্য বা সেবা কেনার সময় ক্রেতা মূল মূল্যের পাশাপাশি যে অতিরিক্ত অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করেন, সেটিই ভ্যাট। বিক্রেতা সরকারের কাছে এই কর জমা দিলেও শেষ পর্যন্ত এর আর্থিক ভার বহন করেন ভোক্তাই।

এই করব্যবস্থার মূল ধারণা হলো উৎপাদন থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যে মূল্য সংযোজন হয়, তার ওপর কর আরোপ করা। ফলে সরকার একটি ধারাবাহিক রাজস্ব উৎস পায় এবং কর ফাঁকির সুযোগও তুলনামূলকভাবে কমে আসে।

বর্তমানে দেশে সাধারণ ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ। তবে কিছু নির্দিষ্ট খাতে ১ দশমিক ৫ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য।

কীভাবে এসেছিল ভ্যাট 

আধুনিক করব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে ভ্যাটকে বিবেচনা করা হয়। ১৯২০ সালে জার্মান ব্যবসায়ী ভন সিমেন্স প্রথম এই ধারণা দেন। পরবর্তীতে ১৯২১ সালে অর্থনীতিবিদ এডামস এর কার্যকর কাঠামো ব্যাখ্যা করেন।

তবে আধুনিক অর্থে প্রথম ভ্যাট চালু করে ফ্রান্স, ১৯৫৪ সালে। পরে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও দ্রুত এই করব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রচলিত বিক্রয় করের তুলনায় এটি অধিক স্বচ্ছ, কার্যকর এবং রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক হওয়ায় অনেক দেশ তা গ্রহণ করে।

ট্যাক্স ফাউন্ডেশন ইউরোপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৫টিরও বেশি দেশে কোনো না কোনো রূপে ভ্যাট চালু রয়েছে।

যেভাবে বাংলাদেশে ভ্যাট চালু হয়

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস ছিল আমদানি শুল্ক, আবগারি শুল্ক ও বিক্রয় কর। কিন্তু আশির দশকে অর্থনীতির আকার বাড়তে থাকলে বিদ্যমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজস্ব সংগ্রহের জন্য আরও কার্যকর ও আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োজন দেখা দেয়।

১৯৭৯ সালে গঠিত করারোপ তদন্ত কমিশন প্রথমবারের মতো বিক্রয় করের বিকল্প হিসেবে ভ্যাট চালুর ধারণা উত্থাপন করে। তবে সে সময় বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে বিক্রয় কর অধ্যাদেশ জারি করে পুরোনো বিক্রয় কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। ফলে সরকার উপলব্ধি করে যে অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন করব্যবস্থা প্রয়োজন।

এ সময় বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের রাজস্ব সংস্কারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে ভ্যাট চালুর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। সে সময় তিনি আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টে সিনিয়র ইকোনমিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

১৯৮৯ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. ওয়াহিদুল হক বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামো উন্নয়নে আইএমএফের কারিগরি সহায়তা চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফ একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে পাঠায়, যার সদস্য ছিলেন আহসান এইচ মনসুরও।

দলটির দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশে ভ্যাট চালুর সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা এবং বাস্তবায়নের উপায় সম্পর্কে সুপারিশ প্রদান করা।

কেমন ছিল এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশে এসে আইএমএফের প্রতিনিধিরা শুধু নীতিগত মূল্যায়নেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভারতের ভ্যাট ব্যবস্থা সরেজমিনে পর্যালোচনা করেন।

এসব দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পান যে, ভ্যাট রাজস্ব বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পরে এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ভ্যাট চালুর সুপারিশ করা হয়।

কারা বিরোধিতা করেছিলেন 

ভ্যাট চালুর উদ্যোগের শুরু থেকেই তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে সরকার।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনায় অনেক উদ্যোক্তা আপত্তি জানান। তাদের আশঙ্কা ছিল, ভ্যাট কার্যকর হলে বিক্রয় ও হিসাব ব্যবস্থায় অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যা অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ তৈরি করবে।

আহসান এইচ মনসুরের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় হাজার হাজার মানুষ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন ঘেরাও করে ‘ভ্যাট চলবে না’ স্লোগান দেয়। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে নতুন করব্যবস্থা তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্বার্থ বিবেচনা করে সরকার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি।

রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আইনি চ্যালেঞ্জ

১৯৯০ সালে ভ্যাট আইন চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়। কিন্তু একই সময়ে গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

ডিসেম্বর ১৯৯০-এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং শাহাবুদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সে সময় সংসদ না থাকায় আইনটি সংসদে পাস করানোর সুযোগ ছিল না। তাই রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির পথ বেছে নেওয়া হয়।

প্রথমদিকে শাহাবুদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেন। তার মতে, একটি অস্থায়ী সরকারের প্রধান হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে এমন আইন জারি করা নৈতিকভাবে অস্বস্তিকর।

তবে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি এবং বাজেট বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেন।


ভ্যাটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা

১৯৯১ সালের ৩১ মে মূল্য সংযোজন কর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর কিছু ধারা ২ জুন থেকে এবং বাকি অংশ ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়।

একই বছরের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ১ জুলাই জাতীয় সংসদে মূল্য সংযোজন কর বিল উত্থাপন করেন।

৯ জুলাই বিলটি সংসদে পাস হয় এবং পরদিন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে আইনে পরিণত হয়। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে ভ্যাটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

শুরুর দিকে ভ্যাটের আওতা ছিল সীমিত। অল্প কয়েকটি পণ্যের ওপর এ কর আরোপ করা হয়েছিল।

পরবর্তীকালে ধাপে ধাপে এর পরিধি বাড়ানো হয়। বর্তমানে উৎপাদন, আমদানি, পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়, পেশাগত সেবা, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, হোটেলসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই কোনো না কোনোভাবে ভ্যাট কার্যকর রয়েছে।

ফলে এটি সরকারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজস্ব উৎসগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

বিতর্ক থেমে নেই 

তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভ্যাট ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক থেমে নেই।

ভোক্তা অধিকারকর্মী ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করলেও পুরো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেয় না। এখনও অধিকাংশ দোকানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবহার হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের বিল বা রসিদও দেওয়া হয় না, ফলে প্রকৃত লেনদেন গোপন রাখার সুযোগ থেকে যায়।

এ ছাড়া সংবাদপত্র, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন ও কিছু সেবাখাতের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাট বাস্তবায়নে বৈষম্য ও অসংগতির অভিযোগ তুলে আসছেন।

অর্থনীতিতে ভ্যাটের প্রভাব 

সব ধরনের বিতর্কের পরও অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের মতে, ১৯৯১ সালে ভ্যাট চালুর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি বিস্তৃত হয়েছে, আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য রাষ্ট্র একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল আয়ের উৎস পেয়েছে।

বর্তমানে দেশের সড়ক, সেতু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়নের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ভ্যাট থেকে। নানা বাধা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে ১৯৯১ সালে যাত্রা শুরু করা এই করব্যবস্থা আজ বাংলাদেশের আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।



/ইউএমএইচ


  বিষয়:   বাংলাদেশ  ভ্যাট 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: