টানা দ্বিতীয় দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের ওপর হামলা-পাল্টাহামলায় লিপ্ত রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য আরও একবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর দ্বারপ্রান্তে। ইরানে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত চলা মার্কিন এই হামলা আগের দিনের তুলনায় আরও তীব্র ও বিস্তৃত বলে মনে হলেও তেহরান ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য খুব একটা প্রকাশ করেনি। মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরানি বন্দর অবরোধ ঠেকাতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার অচল করে দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণা আসার আগেই ভারতের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, কাছাকাছি আরেকটি জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন।
চলতি সপ্তাহে এটি তৃতীয়বারের মতো পাল্টাপাল্টি হামলা, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। প্রথম ধাপে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই দফা সংঘাত শুরু হয়, যার আঘাত লেগেছে অঞ্চলটিতে মার্কিন ঘাঁটি থাকা বিভিন্ন দেশেও।
নতুন করে এই হামলা-পাল্টাহামলা এমন সময় ঘটল যখন যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যত স্থবির। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা আটকে থাকলে তেহরানকে ‘এর মূল্য দিতে হবে’। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ‘যুদ্ধবিরতিকে কার্যত অর্থহীন করে তুলেছে’; তবে তারা যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসার কথা সরাসরি বলেনি।
আলোচনার কেন্দ্রে আছে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ। যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ বিপর্যস্ত করে তুলেছে, জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে এবং খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বহুদূরে ছড়িয়ে দিয়েছে।
ইরান বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেয়, প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এর অর্থ কী তা স্পষ্ট নয়, কারণ যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান ওই জলপথে চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করে রেখেছিল এবং হাতে গোনা কিছু জাহাজ কেবল সুযোগ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এই দাবি অস্বীকার করেছে এবং ট্রাম্প বুধবার বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে নিরাপদে জাহাজ পার করিয়ে আনার একটি গোপন অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও দুই পক্ষের মতবিরোধ অটুট আছে। তেহরান জোর দিয়ে বলছে, কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণ; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আশঙ্কা করছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ ব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র বানানো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বলেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর অন্যতম বড় কারণ ছিল এই সম্ভাবনা চিরতরে রুখে দেওয়া।
ইরানে মার্কিন হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা জবাব : মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, সবশেষ এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে ‘ইরানের অযৌক্তিক ও অব্যাহত আগ্রাসনের জবাবে’ এবং এতে লক্ষ্য ছিল ‘ইরানি সামরিক নজরদারি সক্ষমতা, যোগাযোগব্যবস্থা ও আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা’। হামলার ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তারা জানায়নি। বৃহস্পতিবার ইরানে সূর্যোদয়ের ঠিক আগে হামলা শেষ হয় বলে সেন্ট্রাল কমান্ড উল্লেখ করেছে। হামলার বিস্ফোরণের শব্দ ইরানের রাজধানী তেহরান, বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস এবং হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ড পরে জানায়, আক্রান্ত স্থাপনার মধ্যে রয়েছে একটি উৎপাদন কমপ্লেক্স, একটি সামরিক ব্যারাক ও তেহরানের বাইরে আইআরজিসির একটি ঘাঁটি।
ইরান জানিয়েছে, তারা আগের দিনের মতো কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। হামলার কারণে কুয়েত কয়েক ঘণ্টার জন্য আকাশসীমা বন্ধ রাখলেও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত কিছু জানায়নি। জর্ডান বলেছে, মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি আছে এমন একটি এলাকার দিকে ছোড়া ২০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে, তবে কেউ আহত হয়নি। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানি হামলার জবাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ থেকে ১১ বছর বয়সি এক কিশোরী আহত হয়েছে এবং গাড়ি ও বাড়িঘরের ক্ষতি হয়েছে। ইসরাইল লেবানন থেকে সন্দেহজনক হামলার ইঙ্গিত পেয়ে দেশটির উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের আশ্রয় নেওয়ার সতর্কতা দিয়েছে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে সেখানে ইসরাইলের লড়াই চলছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে গোপনে তেল পার করাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : সরু এই জলপথ কার্যত বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এক শক্তিশালী দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাম্প বুধবার বলেন, ইরানের রাডার সরঞ্জাম ধ্বংস করে গত মাস থেকে প্রণালিতে ইরানি বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে তেলের চালান গোপনে পার করিয়ে দেওয়ার অভিযান চালাচ্ছে মার্কিন সেনাবাহিনী। ট্রাম্প দাবি করেন, এর ফলে ১০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল ইরানের অবরোধ এড়িয়ে যেতে পেরেছে। তবে এই সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। যুদ্ধ শুরুর আগে ওই জলপথ দিয়ে এ পরিমাণ তেল রফতানি হতে প্রায় পাঁচ দিন সময় লাগত।
তবে নাবিকদের জন্য সমুদ্রপথ এখনও বিপজ্জনক। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বৃহস্পতিবার জানায়, ইরানি বন্দরে অবরোধ বলবৎ রাখতে হরমুজ প্রণালির ঠিক বাইরের জলসীমায় একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালানো হয়েছে। বুধবার রাতে ওমান উপসাগরে মার্কিন নির্দেশ না মানায় জাহাজটির দিকে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ইরানের উপকূলীয় জলসীমায় অবরোধ আরোপের পর এ পর্যন্ত ৯টি বাণিজ্যিক জাহাজকে এভাবে অচল করেছে যুক্তরাষ্ট্র বলে তাদের দাবি।
ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এক্সে জানিয়েছেন, ট্যাঙ্কার সেত্তেবেল্লোতে এক মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নিহত হয়েছেন। সেন্ট্রাল কমান্ডের অভিযোগ, জাহাজটি ‘ইরান থেকে তেল পরিবহনের চেষ্টা করে চলমান অবরোধ লঙ্ঘন করেছিল’। বুধবার মার্কিন বাহিনী জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষে গুলি চালিয়ে সেটিকে থামিয়ে দেয়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌসংস্থা আইএমওর প্রধান এই হামলার নিন্দা করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান, হামলায় ‘গভীর উদ্বেগ’ জানাতে এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে তলব করেছে।
দ্রুত শান্তিচুক্তির পথে বড় বাধা : ট্রাম্প এ সপ্তাহের শুরুর দিকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হতে চলেছে। কিন্তু পাল্টাপাল্টি হামলা সেই সম্ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তা ছাড়া বড় বড় মতপার্থক্য রয়েই গেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ত্যাগ করুক। যা অস্ত্রোপযোগী মান থেকে প্রযুক্তিগতভাবে মাত্র এক ধাপ দূরে। ইরান সেই ইউরেনিয়াম ছাড়তে অস্বীকার করছে এবং নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি দাবি করছে। একই সঙ্গে তারা চূড়ান্ত চুক্তির আগেই জব্দ সম্পদ মুক্ত করতে চায়, যা ট্রাম্প সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইরান জোর দিয়ে বলেছে, যুদ্ধ থামানোর যেকোনো চুক্তির আওতায় তাদের মিত্র হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যকার লড়াইও থামাতে হবে। কিন্তু ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সশস্ত্র এই গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার লক্ষ্যেই অটল বলে মনে হচ্ছে। কাতারের একটি কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে তেহরান ছেড়ে গেছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে, যারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য দেয়। অন্যদিকে পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়কেই যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।