গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ১২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধশত স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ে প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব শিক্ষকের কেউ গাজীপুর শহরের জয়দেবপুর, কেউ টঙ্গি, আবার অনেকে উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। এতে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে তাদের দেরি হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলা থেকে এসব শিক্ষক বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এমপি, মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুপারিশের (ডিও লেটার) মাধ্যমে বদলি হয়ে কালীগঞ্জের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন। তারা সরাসরি মন্ত্রণালয় বা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে প্রেষণ আদেশ নিয়ে পদায়িত হওয়ায় অন্যত্র বদলি বা প্রেষণে সংযুক্ত করতে পারছে না জেলা শিক্ষা অফিস।
অভিযোগ আছে, তারা বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হয়েই নামমাত্র দায়িত্ব পালন করে বছরের পর বছর বেতন ভাতাসহ সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। ফলে বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদান এবং শিক্ষার পরিবেশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এসব অনিয়মের ফলে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ স্কুলে অভিভাবকদের বসার জন্য কোনও ছাউনি নেই। বেশির ভাগ স্কুলে ওয়াশ-ব্লক না থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের রিডিং পড়া বা সাবলীল পাঠক তৈরি করার কথা থাকলেও গণিতের সাধারণ যোগ-বিয়োগে পারদর্শী কিনা সেই বিষয়ে নেই কোনও তদারকি।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের কথা বলে প্রধান শিক্ষকরা দুপুরের আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করার প্রবণতা রয়েছে। উপজেলায় প্রায় ৮০০ শিক্ষক কর্মরত থাকলেও গত মাসে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বাছাইয়ে মাত্র ১২জন শিক্ষক অংশ গ্রহণ করেন। এনিয়ে শিক্ষকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রস্তুতির জন্য শিক্ষকদের নির্ধারিত সময়ে অবহিত করা হয়নি।
শিক্ষক পদায়নে কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগ রয়েছে, বেশ কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদায়নের বৈষম্য, প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিতির সংখ্যা তুলনামূলক কম, কর্তৃপক্ষের তদারকির ঘাটতি এবং অনেক বিদ্যালয়ে ছাত্র অনুপাতে শিক্ষক বেশি। কোনও কোনও স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি ২০-৩০ জনের চেয়েও কম। এবং উপজেলার ১২৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা এমন হযবরল।
অভিভাবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, বিদ্যালয়ের প্রধানদের দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহিতা এবং সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতেই হবে। তাদের আশঙ্কা প্রশাসন এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে।
সরকারী বিধিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয় শুরু হওয়ার আগেই প্রধান শিক্ষকদের উপস্থিতি, দৈনন্দিন কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা, সকালের শিক্ষার্থী সমাবেশ, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আরও কার্যকর নজরদারি, প্রধান শিক্ষকদের সময়মত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং, আকস্মিক পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, কিছু শিক্ষক মাঝে মাঝে স্কুলে দেরিতে পৌঁছান। আমি যোগদানের পর থেকে নিয়মিত স্কুল পরিদর্শন করে আসছি। যেসব শিক্ষক বিদ্যালয়ে দেরিতে আসেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মাসুদ ভূঁইয়া মোবাইলে জানান, শিক্ষায় অব্যবস্থাপনা ও কিছু প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলব।
প্রাথমিক শিক্ষায় চরম অব্যবস্থাপনার ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.টি.এম কামরুল ইসলাম সময়ের আলোকে জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে এসব অনিয়ম ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা করব।
সময়ের আলো/আতা