আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা, বাংলাদেশি বলে পুশব্যাক

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার প্রতিবেশী বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা হাকিমপুর গ্রামের একটি চেকপোস্টের কাছে প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে আছেন রইসুল

2026-06-14T02:15:37+00:00
2026-06-14T02:15:37+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা, বাংলাদেশি বলে পুশব্যাক
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ২:১৫ এএম   (ভিজিট : ১০)
সীমান্তে বিএসএফ। সংগৃহীত ছবি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার প্রতিবেশী বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা হাকিমপুর গ্রামের একটি চেকপোস্টের কাছে প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে আছেন রইসুল ইসলাম। তার স্ত্রী ৩৬ বছর বয়সি রেবেকা খাতুন আর দুই ছেলে ১৪ বছরের রিয়াদ ও ১৬ বছরের জুবায়ের পাশেই একটা অসমাপ্ত কাঁচা ইট-সিমেন্টের দালানে বসে আছেন। প্রচণ্ড গরম আর আর্দ্রতার সঙ্গে খাওয়ার পানির অভাবে ওই ঠাসাঠাসি করে থাকা কক্ষটি গরমে যেন এক চুল্লিতে পরিণত হয়েছে।

দালানটিতে ঠাসা লোকজন বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম অভিবাসী, যাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমা লাগিয়ে সীমান্তের এই গ্রামে নিয়ে আসা হয়েছে। এটি ‘শনাক্ত, নির্মূল ও প্রত্যর্পণ’ নীতির অংশ, যা চালু করেছে রাজ্যের নতুন সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকার, যারা এক মাস আগে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার (২ হাজার ৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। সীমান্তের দুই পাড়ের লাখ লাখ মুসলিম ও হিন্দুর অভিন্ন ভাষা বাংলা। 

আর এখনকার বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মধ্যে মূলত দরিদ্র শ্রমিকদের এক শতাব্দীর বেশি পুরোনো অভিবাসনের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু প্রায় ১০ কোটি মানুষের বাসভূমি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর রাজ্যের সরকার অ-নথিভুক্ত মুসলিম অভিবাসীদের খুঁজে বের করার জন্য কঠোর অভিযানের নির্দেশ দিয়েছে, একই সঙ্গে ‘আটক কেন্দ্র’ তৈরির ঘোষণাও দিয়েছে, যেখানে তাদের বন্দি রেখে শেষমেশ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।

এই অভিযান শুধু বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের ভারতীয় মুসলিমদের একাংশের মধ্যেও আশঙ্কা তৈরি করেছে। হয়তো তারাও এমন একটি প্রচারের শিকার হতে পারেন, যা সরকারের পরিষ্কার ভাষ্য অনুযায়ী যাদের টার্গেট করা হচ্ছে তাদের আইনি অবস্থানের চেয়ে তাদের ধর্মীয় পরিচয় দ্বারাই বেশি চালিত। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে, প্রতিবেশী রাজ্য আসামে বিজেপি শাসিত  ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কয়েক ডজন ভারতীয় মুসলিমকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছিল। 

তাদের বিরুদ্ধে অ-নথিভুক্ত অভিবাসী বলে অভিযোগ তোলা হয়। বাংলাদেশ তাদের ফেরত পাঠায়, ফলে তারা সাময়িকভাবে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ আটকা পড়েন। শেষ পর্যন্ত তাদের ভারতে ফিরতে দেওয়া হয়। কিন্তু এই অগ্নিপরীক্ষার জন্য কোনো ব্যাখ্যা তো দূরের কথা, ন্যায়বিচারও তারা কখনো পাননি। এখন এক বছর পর আশঙ্কা বাড়ছে যে পশ্চিমবঙ্গেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।

উন্নত জীবিকার সন্ধানে : 

হাকিমপুর সীমান্ত চেকপোস্টে থাকা অনেকের মতো বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সি ইসলামও ভালো জীবিকার সন্ধানে ভারতে এসেছিলেন। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, আমি আমার স্ত্রীর রোগের চিকিৎসার জন্য দুই বছর আগে এখানে এসেছিলাম, কিন্তু বাংলাদেশের তুলনায় এখানে মজুরি বেশি পেয়ে এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

ইসলাম বলেন, সীমান্ত পার হওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া এক দালালকে তিনি প্রায় ২৫০ ডলার (৩০ হাজার ৭৪৬ টাকা) দিয়েছিলেন, যা তার জন্য অনেক বড় অঙ্কের টাকা। তারা রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় পৌঁছে শহরের উপকণ্ঠে একটি ঘর ভাড়া নেন। দুজনে মিস্ত্রির কাজ করতেন, একসঙ্গে দিনে প্রায় ১০ ডলার (১ হাজার ২৩০ টাকা) আয় করতেন।

কিন্তু গত মাসের শেষ দিকে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অ-নথিভুক্ত বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রত্যর্পণের নির্দেশ দিলে তাদের জীবন বদলে যায়। অধিকারীর দল বিজেপি গত দশকে এমন অভিযান ইতিমধ্যে কয়েকটি রাজ্যে চালিয়েছে। তবে অধিকারীর হুমকির সঙ্গে একটি শর্তও ছিল। উচ্ছেদ অভিযান কেবল মুসলিম বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হবে; হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের অভিবাসীদের বিতর্কিত এক সাংবিধানিক সংশোধনীর আওতায় ছাড় দেওয়া হবে।

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এটাও পরিষ্কার করে দেন যে, কর্তৃপক্ষ আটক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের আগে আদালতে নিয়ে যাওয়ার তোয়াক্কা করবে না। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে, বিদেশি নাগরিকদের ভারতীয় সংবিধানের অধীনে প্রায় কোনো অধিকারই নেই। ফলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, যাদের প্রত্যর্পণ করা হবে তাদের কেন বাংলাদেশে পাঠানো হবে না, তা প্রমাণের দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই।

এর ফলে গত দুই সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে হাজার হাজার মানুষকে ধরে নিয়ে হয় আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে, নয়তো নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সীমান্তে তাড়িয়ে নিয়ে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করেছে। রইসুল ইসলাম বলেন, কর্তৃপক্ষ যাতে তাদের খুঁজে বের করে, সেজন্য তিনি অপেক্ষা করেননি।

তিনি আলজাজিরাকে বলেন, স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের হয়রানির ভয়ে আমরা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিই। হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে জড়ো হওয়া আরও অনেক অভিবাসী একই ধরনের অর্থনৈতিক কষ্টের গল্প শোনান, যে কারণে তারা দালাল ভাড়া করে সীমান্ত পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছেন এবং অনেকের কাছেই বৈধ কোনো নথি নেই।

৪২ বছর বয়সি মিরাজুল গাজী আলজাজিরাকে জানান, তিনি তার স্ত্রী ৩৬ বছর বয়সি সাবিনা ইয়াসমিন আর ১৮ বছর বয়সি ছেলে নাইমকে নিয়ে পাঁচ বছর আগে ভালো সুযোগের সন্ধানে ভারতে এসেছিলেন। এই দম্পতি কলকাতায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন, দিনে প্রায় ১২ ডলার আয় করতেন। কিন্তু সরকারি অভিযানের ফলে তারা দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।

গাজী আলজাজিরাকে বলেন, গত পাঁচ বছরে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি, যতক্ষণ না নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বাড়িওয়ালাকে আমাদের ঘর ছেড়ে দিতে বলে। স্থানীয়দের আক্রমণের ভয়ে আমরা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) দূরে অবস্থিত হাকিমপুর এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য সীমান্ত চেকপোস্টগুলোতে মে মাসের শেষ থেকে বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়মিত স্রোত প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।

হাকিমপুরে কর্মরত এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলজাজিরাকে জানান, প্রতিদিন প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ অ-নথিভুক্ত শরণার্থী ও অভিবাসী এই চেকপোস্টে আসছেন। সেখানে কর্তৃপক্ষ তাদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পাশাপাশি জৈবমিতিক তথ্যও রেকর্ড করছে, যাতে অভিবাসীর সংখ্যার একটি ডিজিটাল নথি তৈরি করা যায়।

শনিবার কলকাতায় সাংবাদিকদের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তার সরকার রাজ্যের সব জেলায় আটক কেন্দ্র স্থাপন করেছে। এই কেন্দ্রগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে। আরও ৮৩৬ জন বর্তমানে আটক কেন্দ্রে রয়েছে। এই ৮৩৬ জনকে শিগগিরই প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ঢাকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন : 

নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে সুদৃঢ় সম্পর্ক ২০২৪ সালে ধাক্কা খায়, যখন বাংলাদেশে তরুণদের নেতৃত্বে এক অভ্যুত্থান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটায়। হাসিনা ছিলেন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এই সহিংস অভ্যুত্থান হাসিনাকে ভারতের রাজধানীতে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে, অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত এই নেত্রীকে প্রত্যর্পণের জন্য ঢাকার পুনঃপুন অনুরোধ নয়াদিল্লি উপেক্ষা করে চলেছে, যা উত্তেজনায় ঘৃতাহুতি দিচ্ছে। এ বছরের শুরুতে বাংলাদেশে হাসিনাবিরোধী জোটের নেতৃত্বে একটি নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, যা এই টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের এই কঠোর অভিযান দুই প্রতিবেশীর মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। ঢাকা অ-নথিভুক্ত অভিবাসীদের জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। গত সোমবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবায়েদ বলেন, এই ইস্যুতে তারা ১২ থেকে ১৩টি চিঠি নয়াদিল্লিকে পাঠিয়েছেন। 

তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে, যা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুসরণ করা উচিত এবং সতর্ক করে দেন যে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর এই কঠোর অভিযান দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, ৪ জুনের পর থেকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) প্রায় ১৮০ জন অভিবাসীকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকানোর কমপক্ষে ১৮টি প্রচেষ্টা তারা ব্যর্থ করেছে। সোমবার পশ্চিমবঙ্গের এই প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দুই বাহিনীর তিন দিনের বৈঠক শুরু হয়েছে। বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘অবৈধভাবে ঢোকানোর’ বিষয়ে ঢাকার পূর্ববর্তী সমালোচনার জবাবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই একটি ‘দ্বিপাক্ষিক কার্যপদ্ধতি’ চালু আছে।

জয়সওয়াল শুক্রবার বলেন, ভারতে অবৈধভাবে থাকা সব বিদেশি নাগরিক, বাংলাদেশের নাগরিকসহ তাদের মোকাবিলায় আমাদের আইন আছে এবং সেই অনুযায়ীই তাদের বিচার করা হবে। আমরা যখন এই মামলাগুলো বাংলাদেশ পক্ষকে তাদের জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য পাঠাই, আর তা একবার যাচাই হয়ে গেলে তখনই আমরা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিই।
জয়সওয়াল জানান, নয়াদিল্লি এমন অনেক বা বহু অনুরোধ পাঠিয়েছে, যা বাংলাদেশ পক্ষের কাছে এখনও মুলতবি রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় ২ হাজার ৮শর বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশির বিস্তারিত তথ্য ও জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছে।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভারতের এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ অনৈতিক বলে আখ্যা দিয়েছে। বৈশ্বিক অলাভজনক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, কোনো বৈধ নথি না থাকা বন্দিদেরও আইনি প্রতিনিধিত্ব দেওয়া উচিত, যাতে কোনো ভারতীয় নাগরিক অন্যায়ভাবে দেশ থেকে বহিষ্কৃত না হন। তিনি ভারতীয় প্রত্যর্পণগুলোকে অবৈধ বলে অভিহিত করেন।

ধর্মীয় উত্তেজনা উসকে দিচ্ছে প্রত্যর্পণ : 

প্রধানত মুসলিম বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রত্যর্পণ পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় উত্তেজনাও উসকে দিচ্ছে, যা বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর প্রকাশ্যে এসেছে। এ রাজ্যের ২৭ শতাংশ জনগণ মুসলিম। কয়েক দশক ধরে বিজেপি বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে আসছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, যিনি মোদির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী, আসামের এক নির্বাচনি জনসভায় তাদের ‘উইপোকা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। আসাম আরেকটি বিজেপি শাসিত সীমান্ত রাজ্য, যেখানে লাখ লাখ বাঙালি-উৎসের মুসলিম বাস করেন এবং যারা একই ধরনের কঠোর অভিযানের মুখোমুখি হয়েছেন।

যদিও ভারতে তিব্বত থেকে আসা হাজার হাজার বৌদ্ধ শরণার্থী এবং শ্রীলঙ্কা থেকে আসা তামিল শরণার্থী বাস করছে তবু বিজেপি ক্রমাগতভাবে মুসলিম অভিবাসীদের (বিশেষ করে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের) তাদের ধর্মের কারণে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গণহত্যামূলক অভিযানের মুখে ৭ লাখেরও বেশি প্রধানত মুসলিম রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে, যাদের সিংহভাগই বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় নেয় এবং অল্পসংখ্যক নয়াদিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে আশ্রয় পায়।

বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বিজেপির টার্গেট করার বিষয়টি দলের বৃহত্তর নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, যার লক্ষ্য ভারতের ২০ কোটি মুসলিমকে প্রান্তিক ও নিগৃহীত করে সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশটিকে একটি জাতিগত হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা। মানবাধিকার কর্মী তিস্তা সেতালবাদ বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ‘শুধু পূর্বনির্ধারিত এজেন্ডা ও বাগাড়ম্বরের ভিত্তিতে’ কাজ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার অ-নথিভুক্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় নিজস্ব নির্দেশিকাও অনুসরণ করছে না।

তিনি আলজাজিরাকে বলেন, দুঃখজনকভাবে পুলিশ লোকজনকে এলোপাতাড়ি ধরে আটক কেন্দ্রে ভরে দিচ্ছে এবং তাদের এমনভাবে পুশব্যাক করার চেষ্টা করছে যেন তারা কোনো পণ্য। আমাদের আশঙ্কা, ব্যক্তিরা বেআইনিভাবে আটক কেন্দ্রগুলোতে বন্দি থাকতে পারেন। তিনি সরকারকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে রাখা অ-নথিভুক্ত অভিবাসীদের পাশাপাশি বাংলাদেশে ‘পুশ আউট’ করে দেওয়া ব্যক্তিদের তথ্য অবিলম্বে প্রকাশ করার দাবি জানান।

এদিকে হাকিমপুরে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সূর্য লম্বা নারকেল গাছগুলোর আড়ালে হারিয়ে যেতে শুরু করলে দুই ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে ইসলামের চোখ অশ্রুতে ভরে ওঠে। তিনি বলেন, আমরা শুধু আমাদের বাচ্চাদের একটা ভালো জীবন দিতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের কোনো কু-উদ্দেশ্য ছিল না। 

কিন্তু কিছু মানুষের বিরামহীন তাড়া খাওয়া আর অপমান আমাদের তিক্ত স্মৃতি নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করল, যে দেশ অহিংসা আর সবার প্রতি দয়ার শিক্ষা দেয়। মুহূর্তখানেক পরেই নিরাপত্তাবাহিনীর দল পুরো পরিবারকে গাড়িতে তোলে নিয়ে যায় ১৮ কিলোমিটার (১১ মাইল) দূরের একটি আটক কেন্দ্রে।

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   আতঙ্ক  পশ্চিমবঙ্গ  মুসলিমরা  বাংলাদেশি  পুশব্যাক 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: