কিম জং উনকে নিয়ে পুতিন-শির টানাটানি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

কমিউনিস্ট আদর্শে পরিচালিত উত্তর কোরিয়া সরকারিভাবে নাম নেয় ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া বা গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া। সংক্ষেপে ডিপিআরকে। প্রায়

2026-06-14T05:47:11+00:00
2026-06-14T05:47:11+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
কিম জং উনকে নিয়ে পুতিন-শির টানাটানি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ৫:৪৭ এএম   (ভিজিট : ১৩)
কিম জং উনকে নিয়ে পুতিন-শির টানাটানি। সংগৃহীত ছবি
কমিউনিস্ট আদর্শে পরিচালিত উত্তর কোরিয়া সরকারিভাবে নাম নেয় ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া বা গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া। সংক্ষেপে ডিপিআরকে। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ৫৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশ উত্তর কোরিয়ার প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে স্থলসীমানা আছে প্রায় ১ হাজার ৩৫২ কিলোমিটার।

অন্যদিকে একসময়ের কমিউনিস্ট শাসনের তীর্থভূমি সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরাধিকার বর্তমানের রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার স্থলসীমা প্রায় ১৭ কিলোমিটার। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তর কেরিয়ার স্থলসীমানা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। অর্থাৎ বিশ্বের দুই সামরিক ক্ষমতাধর দেশের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমানা আছে উত্তর কোরিয়ার।

সেই সূত্রে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছে পিয়ংইয়ং। কিন্তু এই সুসম্পর্কের আড়ালে কি কোনো ‘রেষারেষি’ চলছে? পশ্চিমের দৃষ্টিতে কিম জং উনকে নিয়ে শি-পুতিনের ‘টানাটানি’ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে জেনে নেওয়া যাক চীনের মহাপ্রভাবশালী নেতা শি কেন পিয়ংইয়ং সফরে গেলেন। 

বিশ্বনেতারা চীনে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে তা বিশ্বব্যাপী সংবাদ শিরোনাম হয়। আবার একইভাবে মহাপ্রাচীরের দেশটির শীর্ষনেতা যখন কোনো দেশে যান তখন তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনা দেখা যায়।

চলতি বছর বিশ্বের দুই শীর্ষ পরাশক্তি দেশের প্রধান যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন বেইজিং সফরে গেলেও চীনা নেতা এ বছর এই প্রথম দেশের বাইরে পা রাখলেন। তিনি সফর করলেন দশকের পর দশক ধরে ‘এক ঘরে’ হয়ে থাকা নিকটতম প্রতিবেশী উত্তর কোরিয়ায়। 

গত ৮ জুন বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয় চীনা রাষ্ট্রপতি শি সাধারণত বছরে তিন থেকে চারবারের বেশি বিদেশ সফরে যান না। তাই তার বিদেশ সফর কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করা হয়। এমনকি, শির সফরের মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যায় বেইজিংয়ের কাছে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে কোন বিষয়। 

এতে জানানো হয়, করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ বিরতির পর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা রাষ্ট্রপতি শি মধ্যএশীয় প্রতিবেশী কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন। পরের বছর শি যান প্রধান মিত্র রাশিয়ায়। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে মস্কো সফর করে তিনি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। 

এ ছাড়া, ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১১ বার রাশিয়া সফর করে চীনা নেতা নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। কেননা তিনি এত বেশিবার একটি দেশ আর সফর করেননি।

২০২৪ সালের মে মাসে সে বছরের বিদেশ সফর শুরু করেন শি জিনপিং। সেবার তিনি ইউরোপের তিন দেশ ফ্রান্স, সার্বিয়া ও হাঙ্গেরি সফর করেছিলেন। তখন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপের সঙ্গে চীনের টানাপোড়েন চলছিল। এর প্রভাব পড়ছিল বাণিজ্যেও। ২০২৫ সালে শির বিদেশ সফর শুরু হয়েছিল এপ্রিলে; গিয়েছিলেন আসিয়ান জোট সদস্য ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ায়।

চলতি বছর চীনা নেতা বিদেশ সফর শুরু করলেন অন্যতম প্রধান মিত্র উত্তর কোরিয়া সফরের মধ্য দিয়ে। গত ৮ জুন ২ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে পিয়ংইয়ংয়ে পা রাখেন তিনি। সেদিন চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার বরাত দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম কোরিয়া হেরাল্ড জানায়, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের বাইরে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে চীনের নেতার এই সফর। দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানোর সম্ভাব্য ক্ষেত্র হচ্ছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পর্যটন। এ ছাড়া, আলোচনায় আছে আঞ্চলিক বিষয়ে দুই দেশের কৌশলগত সমন্বয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ জিয়েওংসাং প্রদেশের কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক লিম ইউল-চুল মনে করেন খুব সম্ভব শি ও কিমের বৈঠকে অর্থনৈতিক বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘চীন হয়তো অল্পদিনের জন্য হলেও লক্ষ্য বদলিয়ে ফেলছে। উত্তর কোরিয়াকে পরমাণুমুক্ত করার বদলে এই পরমাণু শক্তিধর দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কৌশলগতভাবে ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।’

কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিনও মনে করেন চীন ও উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিক সমন্বয়করণের ওপর অতীতের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। গত ৯ জুন শির সফরের দ্বিতীয় দিনে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়া হেরাল্ড জানায়, উত্তর কোরিয়া ও চীনের শীর্ষ নেতারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তবে একই প্রতিবেদনে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের ডিশটিংগুইশড প্রফেসর ইয়াং মু-জিন জানান, শি জিনপিং এমন সময় পিয়ংইয়ং সফরে এলেন যখন চীন প্রতিবেশী উত্তর কোরিয়ার ওপর প্রভাব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কেননা পিয়ংইয়ং ক্রমশ মস্কোর ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। তার মতে চীন চায় উত্তর কোরিয়া যেন রাশিয়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বেইজিং কোরীয় উপদ্বীপে নিজের প্রভাব বজায় রাখতে চায়।

ইয়াং মু-জিনের ভাষ্য, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রেখে দুই মিত্র দেশ থেকে সুবিধা নিতে চায় পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়া তার সামরিক নিরাপত্তার জন্য রাশিয়ার ওপর ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য চীনের ওপর নির্ভর করতে চায়, বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে পশ্চিমের গণমাধ্যমগুলো শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফরকে ‘বিরল’ ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

গত ২৭ মে ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সাময়িকী ফরেন পলিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়- সাত বছরের দূরত্ব কমাতেই চীনা নেতার উত্তর কোরিয়া সফর। এতে আরও বলা হয় পিয়ংইয়ং কাগজে-কলমে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও পর্দার আড়ালে দেশ দুটির মধ্যে প্রায়শই দ্বন্দ্ব দেখা যায়। চীন চায় না, বিশ্বমঞ্চে উত্তর কোরিয়া পরমাণু শক্তির খেতাব পাক।

অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা পিয়ংইয়ংয়ের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয় বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ৮ জুন চীনের রাষ্ট্রপতি শি উত্তর কোরিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এমন প্রশ্ন দেখা যায় পশ্চিমের দেশগুলোর সংবাদমাধ্যমগুলোয়। দীর্ঘ সাত বছর পর শির উত্তর কোরিয়া সফরের একদিন আগে দ্য ইকোনমিস্ট এক সংবাদের শিরোনাম করে কিম-শি সম্মেলন; উত্তর কোরিয়ায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে চীন ও রাশিয়ার প্রতিযোগিতা।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয় শি জিনপিং উত্তর কোরিয়ায় গিয়েছিলেন ২০১৯ সালে। এমন এক সময় তিনি পিয়ংইয়ং গেলেন যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের বিষয়ে কাজ করছে। উত্তর কোরিয়ার কিমের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ সৃষ্টির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জাতিসংঘের উদ্যোগের অংশ হিসেবে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর ক্রমাগত কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে।

যদিও ভ্লাদিমির পুতিন ও শি জিনপিং উভয়ই কিম জং উনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়- মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম দফার শাসনামলে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম দুবার মার্কিন নেতার সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলন করেছিলেন। তবে দ্বিতীয় সম্মেলনটি ব্যর্থ হয়েছিল। ‘শির উত্তর কোরিয়া সফরকালে পরমাণু বিষয়টি আলোচনায় নেই’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়েছে- ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা করায় ক্রেমলিন উত্তর কোরিয়াকে সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকে সহায়তা করতে চায়। 

প্রতিবেদন অনুসারে মস্কো ও পিয়ংইয়ং তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ইস্যুকে রাশিয়া সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু কর্মসূচিকে মেনে নিয়েছে মস্কো। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারগেই লাভরভ এই বিষয়টিকে ‘ক্লোজড ইস্যু’ বলে মন্তব্য করেছেন।

গত ৯ জুন কোরিয়া হেরাল্ড এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে ‘কিম ও শি উত্তর কোরিয়া-চীনের জোরদার সম্পর্ক চায়। পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে দুজনই চুপ’। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায় উত্তর কোরিয়াকে চীন কাছে টানতে চায়; তবে পিয়ংইয়ংকে সতর্কাবস্থায় দেখা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে বিশ্ববাসী ইতিমধ্যে জেনেছে যে, বেশ কয়েক হাজার উত্তর কোরীয় সেনা রাশিয়ার পক্ষ নিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনবিরোধী পশ্চিমের সামরিক কর্মকর্তাদের হিসাবে এই সংখ্যাটি ৬ হাজারের বেশি হবে। গত ২৮ এপ্রিল বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত উত্তর কোরীয় সেনাদের স্মরণে গড়া স্মৃতিসৌধ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এর মাধ্যমে মস্কো-পিয়ংইয়ং সম্পর্ক বিষয়ে সম্যক ধারণা পাওয়া যায় বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের অনেকের মতে- বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন গত দুই দশক ধরে বিশ্বমঞ্চে ক্রমেই প্রভাব বাড়িয়ে চলছে। ইউরোপ-আমেরিকা-এশিয়া-আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া তথা সব মহাদেশেই মহা-আড়ম্বরেই মহাচীনের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। সেই উপস্থিতির অংশ হিসেবে শি জিনপিং ‘বন্ধু’ কিম জং উনের সঙ্গে দেখা করলেও তা যদি দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের ‘ভারসাম্য’ তৈরিতে কাজ করে তা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে কি?

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   কিম জং উন  পুতিন  শি  টানাটানি 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: