মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার (১৪ জুন) ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা ঘোষণা করে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়ার বার্তা দিলেও, বিশ্ববাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনও শুরু হয়নি।
বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘মেরিনট্রাফিক’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি জানিয়েছে, চুক্তির ঘোষণার পর মাত্র ৭টি জাহাজ এই প্রণালি পার হতে পেরেছে। অথচ বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় অন্তত ২৫০টি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার এবং ৩৩০টি পণ্যবাহী জাহাজসহ প্রায় ৫৮০টি বাণিজ্যিক নৌযান হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় আটকা পড়ে আছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর পর থেকেই তেহরান এই কৌশলগত জলপথটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই পরিবাহিত হয়।
আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবুজ সংকেতের পরও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পথে মূলত তিনটি বড় বাধা কাজ করছে। এগুলো হলো— নিরাপত্তা ও সুরক্ষাজনিত শঙ্কা, সাগরে মাইনের উপস্থিতি এবং নতুন ট্রাফিক টোল বা ফি আরোপের জটিলতা।
নিরাপত্তাজনিত চরম অনিশ্চয়তা :
প্রথম বড় বাধাটি হলো নিরাপত্তা ও সুরক্ষাজনিত চরম অনিশ্চয়তা। সংকট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘ইওএস রিস্ক গ্রুপ’ জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই প্রণালিতে ঢুকলেই তেহরান গুলি ছুড়েছে। অন্যদিকে গত এপ্রিল থেকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডও নির্দেশ অমান্যকারী ৯টি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সেগুলো অচল করে দেয়।
যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন, তবে স্যাটেলাইট চিত্রে ওমান উপসাগরের প্রবেশমুখে এখনও মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’ জানিয়েছে, অতীতের তেহরানের সিদ্ধান্ত বদলের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে জাহাজের ক্যাপ্টেন, মালিক ও বিমা কর্তৃপক্ষ এখনই ঝুঁকি নিয়ে সাগরে নামতে চাইছে না। সবাই আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
সামুদ্রিক মাইন :
দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা হলো সামুদ্রিক মাইনের হুমকি। যুদ্ধের শুরুতে ইরান হুমকি দিয়েছিল যে তাদের উপকূলে হামলা হলে তারা সাগরে ভাসমান মাইন পুঁতে রাখবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছেন যে ইরান হরমুজ প্রণালির একটি বিশাল অংশে মাইন ছড়িয়ে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিনগুয়েজ বলেন, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে মাইন অপসারণই এখন প্রধান কাজ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমান ঘেঁষা দক্ষিণ দিকটি নিরাপদ মনে হলেও প্রধান চ্যানেলটি মাইনমুক্ত করার কাজ অত্যন্ত ধীরগতির হবে, যাতে ৩০ দিন থেকে শুরু করে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স তাদের বিশেষ মাইন অনুসন্ধানকারী নৌযান ওই অঞ্চলে পাঠিয়েছে।
টোল বা সার্ভিস ফি আদায়ের জটিলতা :
তৃতীয় বাধাটি হলো এই জলপথ ব্যবহারের জন্য নতুন টোল বা সার্ভিস ফি আদায়ের জটিলতা। ঐতিহাসিকভাবে হরমুজ প্রণালি একটি প্রাকৃতিক জলপথ হওয়ায় এখানে কোনো ফি ছাড়াই জাহাজ চলাচল করত। জাতিসংঘ সমুদ্র আইন অনুযায়ীও এটি হওয়ার কথা। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন ইরান এই জলপথের ওপর নিজস্ব সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ গঠন করে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘ফারস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন চুক্তি অনুযায়ী ইরান ও ওমান যৌথভাবে এই প্রণালি পরিচালনা করবে এবং যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর একটি ‘সার্ভিস ফি’ বসানো হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন ফি পদ্ধতি প্রতিদিন জাহাজ পারাপারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের লজিস্টিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
আগামী শুক্রবার চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হলে এই প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক বা নিরাপত্তার দিক থেকে প্রণালিটি দ্রুত উন্মুক্ত করা হলেও বাণিজ্যিক জাহাজ পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি আগের মতো স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
সময়ের আলো/জেডি