শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ এখন অনেক নারীর নিত্যসঙ্গী। অফিসে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করা, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়া কিংবা রাতে নিরাপদে বাসায় ফেরা, সব ক্ষেত্রেই অ্যাপভিত্তিক পরিবহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের কাছে এটি সময় বাঁচানো এবং তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের একটি মাধ্যম। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, রাইড শেয়ারিংয়ে নারীরা কতটা নিরাপদ?
বর্তমানে বেশিরভাগ রাইড শেয়ারিং অ্যাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা ফিচার যুক্ত করা হয়েছে। লাইভ লোকেশন শেয়ার, ট্রিপ ট্র্যাকিং, জরুরি সহায়তার জন্য এসওএস বাটন এবং চালকের পরিচয় যাচাইয়ের মতো সুবিধা ব্যবহারকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে যাত্রার তথ্য শেয়ার করার সুযোগও অনেক নারী ব্যবহার করছেন।
তবে প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। মাঝেমধ্যে যাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, অনাকাক্সিক্ষত প্রশ্ন, ভুল রুটে যাওয়ার চেষ্টা কিংবা হয়রানির অভিযোগও শোনা যায়। অনেকে মনে করেন, প্রযুক্তি নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করলেও সচেতনতার বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন
অনেক সময় দেখা যায়, অ্যাপে যে চালকের ছবি ও গাড়ির নম্বর দেওয়া আছে, বাস্তবে এসেছেন অন্য কেউ। ‘অন্য ভাইয়ের আইডি দিয়ে চালাচ্ছি’ এমন অজুহাত দিয়ে চালকরা পার পেয়ে যেতে চান, যা নারীর নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী অর্পিতা মেহজাবিন বলেন, ‘ক্লাস বা কোচিং শেষে বাসায় ফিরতে রাইড শেয়ারিং ব্যবহার করি। এতে সময় বাঁচে, তবে রাইড শুরু হওয়ার আগে চালকের তথ্য ও গাড়ির নম্বর মিলিয়ে নিই।’
গণমাধ্যমকর্মী মায়মুন্না আক্তার বলেন, ‘আগে অফিস শেষে বাস বা সিএনজির জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হতো। এখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি পাওয়া যায়। তবে রাতে একা যাতায়াত করলে এখনও কিছুটা উদ্বেগ কাজ করে।’
এ ছাড়া রাইড শেয়ারিং অ্যাপে যাতায়াতকারী নারীদের একাংশ চালক কর্তৃক মৌখিক হেনস্থা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোঁজার মতো বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন। অনেক চালক ট্রিপ শেষ হওয়ার পর যাত্রীর ব্যক্তিগত নম্বরে কল বা মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করেন। আবার অফলাইনে (অ্যাপ ছাড়া) চুক্তিভিত্তিক ট্রিপে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে, যেখানে কোনো ডিজিটাল ট্র্যাকিং থাকে না। ফলে এই অফলাইন যাত্রাগুলো নারীদের চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা কলেজের শিক্ষক আমেনা আক্তার লিপি বলেন, ‘রাইড শেয়ারিং নারীদের চলাচলের স্বাধীনতা বাড়িয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু প্রযুক্তির ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। অ্যাপ কোম্পানি, চালক এবং যাত্রী- সবার সচেতনতা জরুরি।’
রাতের শহরে কর্মরত নারীদের জন্য রাইড শেয়ারিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। হাসপাতালের চিকিৎসক, সংবাদকর্মী, কল সেন্টারকর্মী কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রাতের শিফটে কাজ করা নারীরা প্রায়ই এই সেবা ব্যবহার করেন। তাদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ি পাওয়া এবং যাত্রার ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত পরিবহনের তুলনায় নিরাপদ অনুভূত হয়।
তবে নিরাপদ যাত্রার জন্য কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখা প্রয়োজন। রাইড বুক করার পর চালকের ছবি, নাম এবং গাড়ির নম্বর ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া উচিত। গাড়িতে ওঠার পর পরিবারের কাউকে লাইভ লোকেশন পাঠানো যেতে পারে। প্রয়োজনে জরুরি নম্বর ফোনে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। যাত্রাপথে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপের অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিষয়টি জানানো উচিত।
রাইড শেয়ারিংয়ে হয়রানির শিকার হলে চুপ করে না থেকে দ্রুত অভিযোগ জানানো গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ অ্যাপে সরাসরি অভিযোগ করার ব্যবস্থা রয়েছে। গুরুতর ঘটনার ক্ষেত্রে নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি বা আইনি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি যাত্রার স্ক্রিনশট, চালকের তথ্য এবং ট্রিপ হিস্টোরি সংরক্ষণ করলে তদন্তে সহায়তা পাওয়া সহজ হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর এই সেবা নারীদের চলাচলকে নিঃসন্দেহে সহজ করেছে। কর্মজীবন, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অ্যাপের ফিচারের ওপর নির্ভর করলেই হবে না। সচেতন ব্যবহার, দ্রুত অভিযোগ এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলেই রাইড শেয়ারিং নারীদের জন্য আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
রাইড শেয়ারিং অ্যাপ নারীর স্বাধীন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। তবে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হওয়ার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। নিরাপদ যাত্রার পথ তখনই সুগম হবে, যখন প্রযুক্তি ও দায়িত্বশীলতা একসঙ্গে কাজ করবে।
এএডি/