দুর্ঘটনার পর ‘গোল্ডেন আওয়ার’ পার হয়ে বাড়ছে প্রাণহানি

জাহেদুল ইসলাম

সারাদেশ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দক্ষিণ চট্টগ্রাম অংশ দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। পর্যটন নগরী কক্সবাজার, পার্বত্য জেলা বান্দরবানসহ দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের

2026-06-17T13:37:01+00:00
2026-06-17T19:19:31+00:00
 
  শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
ট্রমা সেন্টার নেই সাতকানিয়ায়
দুর্ঘটনার পর ‘গোল্ডেন আওয়ার’ পার হয়ে বাড়ছে প্রাণহানি
জাহেদুল ইসলাম
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১:৩৭ পিএম  আপডেট: ১৭.০৬.২০২৬ ৭:১৯ পিএম
সাতকানিয়ায় ট্রমা সেন্টার স্থাপিত হলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে। ছবি : লেখক সৌজন্যে
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দক্ষিণ চট্টগ্রাম অংশ দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। পর্যটন নগরী কক্সবাজার, পার্বত্য জেলা বান্দরবানসহ দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা এই সড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, কনটেইনারবাহী যান, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন এ পথে চলাচল করে। কিন্তু এই মহাসড়কের সাতকানিয়া অংশে নেই কোনো আধুনিক ট্রমা সেন্টার। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। দুর্ঘটনার পরপরই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মহাসড়কের সাতকানিয়া অংশে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। কখনও বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ, কখনও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, আবার কখনও পথচারীরাও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এতে আহতদের অনেকেই গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সংকটাপন্ন হয়ে পড়েন।

আহত রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনায় শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, মাথায় আঘাত, হাড় ভেঙে যাওয়া কিংবা অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে রোগীর মৃত্যু বা স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সাতকানিয়ায় এমন কোনো আধুনিক ট্রমা সেন্টার নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও তা মহাসড়ক থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং সেখানে গুরুতর আহত রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রমা কেয়ার সুবিধা নেই। ফলে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল বা নগরীর অন্যান্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়।


চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা ‘গোল্ডেন টাইম’। এই সময়ের মধ্যে রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জসিম উদ্দীন বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে রোগীকে বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া গেলে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আবার উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম শহরে পাঠাতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় অনেক সময় ব্যয় হয়। ফলে রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে।’

এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে রোগীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। বিশেষ করে মাথায় আঘাত পাওয়া রোগী, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা একাধিক স্থানে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত অস্ত্রোপচার বা নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা যত বাড়ছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় জরুরি চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন হয়নি। তাদের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পে সড়ক সম্প্রসারণ, সেতু নির্মাণ ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়ে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।


সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থানীয় জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হলেও, এটি মূলত সাধারণ চিকিৎসা প্রদানের জন্য পরিচালিত। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নিবিড় পরিচর্যা সুবিধার অভাবে রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করতে হয়।

স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের অনেক সময় দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স সংকটও দেখা দেয়। আবার যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগে হাসপাতালে পৌঁছাতে। এতে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদেরও নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। একদিকে রোগীর জীবন বাঁচানোর উদ্বেগ, অন্যদিকে পরিবহন খরচ, চিকিৎসা ব্যয় ও সময়ের চাপ- সব মিলিয়ে পরিবারগুলোকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। 

স্থানীয়দের মতে, সাতকানিয়ায় আধুনিক ট্রমা সেন্টার থাকলে এসব ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসত। আহতদের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা স্থানীয় পর্যায়েই নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। মহাসড়কে দুর্ঘটনার পর চিকিৎসাসেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় জনগণের মধ্যে। তাদের দাবি, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের পাশে জরুরি চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।


স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় মানুষ হতাহত হওয়ার পরও ট্রমা সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে দুর্ঘটনায় আহতদের ভাগ্য অনেকাংশে নির্ভর করছে তারা কত দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছাতে পারবেন তার ওপর। তাদের মতে, ‘আধুনিক ট্রমা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা গেলে শুধু সাতকানিয়ার মানুষ নয়, মহাসড়ক ব্যবহারকারী লাখো যাত্রী উপকৃত হবেন।’ 

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমি সংসদ সদস্য থাকাকালে লোহাগাড়ায় একটি ট্রমা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ও অকার্যকর অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উদ্যোগ নিয়ে ট্রমা সেন্টারটি পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করি। গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সাতকানিয়ায়ও একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

/মহু


  বিষয়:   ট্রমা সেন্টার  দুর্ঘটনা  গোল্ডেন আওয়ার  সাতকানিয়া  চট্টগ্রাম  চিকিৎসা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: