যদি শোনেন, এক জোড়া আম লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয়, নিশ্চয়ই অবাক হবেন? জাপানের ‘মিয়াজাকি’ তেমনই আম। এটি একইসঙ্গে বিরল এবং বিলাসবহুল। কিন্তু সেই একই আম বাংলাদেশে বিক্রি হয় নামমাত্র মূল্যে, যেন এটি কেবলমাত্র রঙিন একটি আকর্ষণীয় ফল। কেন দামের এমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য? চলুন, জেনে নেওয়া যাক।
গ্রীষ্ম মানেই আমের মৌসুম। পৃথিবীর নানা দেশে শত শত জাতের আম চাষ হয়। কোনো আম সুগন্ধের জন্য বিখ্যাত, আবার কোনোটি মিষ্টতার কারণে মানুষের মন জয় করে নেয়। তবে এমন কিছু আম রয়েছে, যেগুলোর পরিচয় শুধু স্বাদে সীমাবদ্ধ নয়। সেগুলো বিলাসিতা, আভিজাত্য এবং বিশেষ মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে জাপানের এই বিখ্যাত মিয়াজাকি আম।
সাধারণ ফলের বাজারে যে আমের দেখা মেলে, মিয়াজাকি তার থেকে অনেকটাই আলাদা। অনেকেই একে ‘প্রকৃতির তৈরি এক মূল্যবান রত্ন’ বলে অভিহিত করেন। জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের মিয়াজাকি অঞ্চলে উৎপাদিত এ আম স্থানীয়ভাবে ‘সূর্যের ডিম’ নামে পরিচিত। দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পেয়ে ফলটি যখন পরিপূর্ণতা অর্জন করে, তখন এর খোসা ধারণ করে উজ্জ্বল লালচে আভা। দূর থেকে দেখতে অনেকটা রুবি পাথরের মতো মনে হয়। সাধারণ হলুদ বা সবুজ আমের ভিড়ে এর উপস্থিতি সহজেই আলাদা করে চেনা যায়।
এই আমের বিলাসবহুল মর্যাদার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো এর উৎপাদন প্রক্রিয়া। ভালো মানের আমের জন্য কৃষকরা যত্ন সহকারে আম গাছগুলোর জন্য গ্রিনহাউসের ব্যবস্থা করেন। প্রতিটি ফলকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফল যাতে পর্যাপ্ত আলো পায়, সেজন্য গাছের ডালপালা পর্যন্ত বিশেষভাবে পরিচর্যা করা হয়। যখন আম পাকতে শুরু করে, তখন সেটিকে একটি জালের মধ্যে রাখা হয়। এই জাল গ্রিনহাউস সিলিংয়ের সঙ্গে একটি ওভারহেড তারের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা থাকে। ফলে প্রতিটি ফল গ্রিনহাউস গ্লাসে প্রতিফলিত সূর্যালোক পায়। এটি আমের বৃদ্ধির পাশাপাশি নজরকাড়া গভীর লাল রং পেতেও সহায়তা করে। এমনকি গাছ থেকে স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়লেও ফলের গায়ে কোনো আঘাত লাগে না।
সম্পূর্ণরূপে পেকে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে এ আম ছিঁড়ে ফেলা হয় না। বরং সেগুলো গাছ থেকে পড়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়। চূড়ান্তভাবে বাজারে সরবরাহের আগে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে আমের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়। এই সূক্ষ্ম যত্নই নিশ্চিত করে, বাজারে পৌঁছানো প্রতিটি আম দেখতে এবং মানের দিক থেকে প্রায় নিখুঁত হবে।
বিশ্বের অনেক দেশে ফল কেজি দরে বিক্রি হয়, কিন্তু মিয়াজাকি আমের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। জাপানে বিশেষ নিলামে এই আমের জোড়া অবিশ্বাস্য মূল্যে বিক্রি হওয়ার ঘটনা প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয়। জাপানে মিয়াজাকি আমের সর্বোচ্চ ফলন হয় এপ্রিল থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে। গাছ থেকে সংগ্রহের পর আমগুলো চলে যায় নিলামে। প্রতি বছর এপ্রিল মাসে জাপানের মিয়াজাকি শহরের পাইকারি বাজারে শুরু হয় এই নিলাম। কখনও কখনও ২টি আমের মূল্যই লাখ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়। ২০১৬ সালে জাপানের ফুকুওকায় নিলামে এক জোড়া মিয়াজাকি আমের মূল্য উঠেছিল ৫ লাখ জাপানি ইয়েন। মূল্যটি সে সময়ের বাজারদর অনুযায়ী ৪ হাজার ৫৪৭ মার্কিন ডলারের সমতুল্য। ২০১৯ সালে দাম উঠেছিল প্রায় ৫ হাজার মার্কিন ডলার, যা সে সময়ের বাজারদর অনুযায়ী প্রায় ৪ লাখ টাকারও বেশি।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই আমগুলোর কেনাবেচা শুধুমাত্র সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ উপলক্ষে, ব্যবসায়িক উপহার কিংবা সম্মানিত ব্যক্তিদের জন্য এটি মর্যাদাপূর্ণ উপহার হিসেবেও বিবেচিত হয়। এমনকি হাত বদলের আগে আমলোকে যত্ন সহকারে সূক্ষ্ম কারুকাজ মেশানো বাক্স বা মোড়কে ভরা হয়।
মিয়াজাকি আমের আরেকটি আকর্ষণ হলো এর স্বাদ। ফলটির শাঁস অত্যন্ত কোমল এবং রসে পরিপূর্ণ। মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টতা ও সুগন্ধের এক অনন্য অনুভূতি তৈরি হয়। অনেক ফলরসিকের মতে, এই আমের স্বাদে একাধিক ফলের সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় খুঁজে পাওয়া যায়। পুষ্টিগুণের দিক থেকেও এই আম সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ উপাদান এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশেও বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়েছে এই আমের। তবে, বাংলাদেশে মিয়াজাকি আম বিক্রি হয় কেজি দরে। একই নামে বিক্রি হওয়া এই আম শুরুতে কেজি প্রতি ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। তারপর ক্রমশ দাম কমেছে। বিগত কয়েক বছরে কেজি প্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত দাম ছিল। এবার চলতি মৌসুমে সেই দাম কমে দাড়িয়েছে কেজি প্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যের এই তারতম্যের প্রধান কারণ উৎপাদন পদ্ধতি ও বাজারব্যবস্থার পার্থক্য। পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ার কারণে উৎপাদন খরচও অনেক কম। কারণ, বাংলাদেশে শ্রম ও জমির ব্যয় জাপানের মতো বেশি নয়। এ ছাড়া দেশের বাজারে ‘মিয়াজাকি’ নামে বিক্রি হওয়া সব আম জাপানের প্রিমিয়াম মানের ‘তাইয়ো নো তামাগো’ গ্রেডের নয়। যদিও একই জাতের চারা ব্যবহার করা হয়, তবু আবহাওয়া, পরিচর্যা, মিষ্টতার মাত্রা ও বাজারজাতকরণে পার্থক্য থাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ ২৫ টন মিয়াজাকি উৎপাদিত হয়েছে। বাংলাদেশে এ আম চাষ শুরু হওয়ার পর এবার সর্বোচ্চ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মিয়াজাকি আমের উৎপাদন তুলনামূলক বেশি। এ অঞ্চলে ভালো উৎপাদনের কারণ হিসেবে এখানকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকেই মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায়ও চাষ হচ্ছে মিয়াজাকি।
/মহু