প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘনঘন লোডশেডিং ও লো ভোল্টেজে সাতক্ষীরার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলে দিন-রাত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, রোগী, শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ। তবে বুধবার জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর সাথে কথা বললে তিনি সাতক্ষীরা পৌরসভার জন্য অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চাহিদার প্রায় ৩৭ শতাংশ ঘাটতির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলায় মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৬ হাজার। এরমধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় বর্তমানে ৬ লাখ ৪৭ হাজার ২৪ জন গ্রাহক রয়েছেন। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো)-এর আওতায় সাতক্ষীরা শহরাঞ্চলে গ্রাহক সংখ্যা ৫৮ হাজার ৫৯৮ জন।
ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি না পাওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। পৌর এলাকায় তাও কিছুটা বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও, সদরের গ্রামগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রাতে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে।
সাতক্ষীরা বিসিক শিল্পনগরী সূত্র জানায়, ৪২টি কারখানাসহ সদরের শত শত লেদ ও চালকলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকেরা অলস বসে থাকছেন, অথচ মালিকদের গুনতে হচ্ছে নিয়মিত বেতন। দাবদাহের কারণে ফসলের মাঠ শুকিয়ে চৌচির হলেও বিদ্যুৎ সংকটে সেচ পাম্পগুলো চালানো যাচ্ছে না। এতে আমন ও রবি শস্যের আবাদ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।
রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে ভাইরাসজনিত রোগ ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ায় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে রোগীর ভিড় উপচে পড়ছে।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন বলেন, পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে পড়াশোনা ব্যাহত হয়। অনেক সময় মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে পড়তে হয়। প্রচণ্ড গরমে পড়াশোনায়ও মন বসে না।
শহরের কাটিয়া এলাকার গৃহবধূ সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রচণ্ড গরমে লোডশেডিংয়ে জীবন যায়যায় অবস্থা হয়। একবার বিদ্যুৎ গেলে এক ঘণ্টার আগে আসে না। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারের কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। ছোট বাচ্চারা কান্নাকাটি করে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জীবন যাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার আব্দুল হাকিম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে পানির মোটর চলে না। রান্না-বান্না, গোসল থেকে শুরু করে সব কাজেই সমস্যা হয়। রাতের বেলা গরমে ঘরের ভেতর থাকা যায় না।
কৃষি খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শ্যামনগর উপজেলার কৃষক আব্দুল হালিম জানান, সেচ পাম্প চালাতে সমস্যা হচ্ছে। সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফ্রিজ, কোল্ডস্টোরেজ, বরফকল ও মাছ সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জানা যায়, ২০২২ সালে জাতীয় জ্বালানি সংকটের সময় সাতক্ষীরাসহ সারা দেশে ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হয়। ২০২৪ সালে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১১০ মেগাওয়াট, সরবরাহ পাওয়া যেত ৬৮ মেগাওয়াট। তখনও প্রায় ৪২ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। বর্তমানে চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সচেতন মহলের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুতের অপচয় রোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
জেলার সাধারণ মানুষের দাবি, তাপদাহের এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়বে।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মুহা. আজিজুর রহমান সরকার বলেন, গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় কিছু এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) সাতক্ষীরা বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সোয়াইব হোসেন বলেন, শহরাঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। কোথাও কোনো কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত তা সমাধানের জন্য আমাদের টিম কাজ করছে।
সাতক্ষীরা সদর-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক বলেন, সাতক্ষীরায় বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় জনদুর্ভোগ বাড়ছে। বিষয়টি আমি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছি এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। জেলার জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বরাদ্দ ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের দাবি জানিয়েছি। আশা করছি, সরকার দ্রুতই এ সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম সাহেবের সাথে সাতক্ষীরার লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে কথা বলেছেন। এরপর বুধবার দুপুরে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) সাতক্ষীরা বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সোয়াইব হোসেন তাকে জানান, সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ করা হয়েছে। এতে করে পৌর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নতি হয়েছে।
সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুপুর থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ রয়েছে। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীকে সাতক্ষীরা পৌরবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান।
সময়ের আলো/আতা