প্রায় চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি করলেও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির পথে এখনো অনেক জটিল ও স্পর্শকাতর ইস্যু রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ হবে না।
শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এই আলোচনাতেই নির্ধারিত হবে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর উভয় দেশ স্থায়ী সমঝোতার দিকে এগোতে পারবে কি না। যদিও উভয় পক্ষই সংঘাতের অবসান চায়, তবুও পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসসহ একাধিক বিষয় আলোচনাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচিই সবচেয়ে বড় বাধা
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎই আলোচনার সবচেয়ে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগোচ্ছে। যদিও তেহরান বারবার দাবি করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই মজুদ হয় ধ্বংস করতে হবে, নয়তো আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে দেশের বাইরে পাঠাতে হবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা তাদের পারমাণবিক সম্পদ পুরোপুরি ত্যাগ করবে না। তবে কিছু সূত্রের মতে, ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমানোর বিষয়ে তেহরান সীমিত সমঝোতায় রাজি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতে ইরান কতটা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতিনির্ধারক "শূন্য সমৃদ্ধকরণ" নীতি সমর্থন করলেও ইরান এটিকে তাদের সার্বভৌম অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ফলে এই ইস্যুতে সমঝোতা না হলে পুরো আলোচনাই ভেঙে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিদর্শন নিয়ে মতপার্থক্য
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির অধীনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইইএই) ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক পরিদর্শনের সুযোগ পেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে সেই ধরনের কঠোর পরিদর্শন ব্যবস্থা পুনরায় চালু হোক।
কিন্তু ইরানের অনেক রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা মনে করেন, অতীতে এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি শক্তির হাতে পৌঁছেছে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন উত্তেজনার আশঙ্কা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী যুদ্ধের সময় বড় ধরনের আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান কার্যত এই নৌপথ বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দেয়।
সমঝোতা অনুযায়ী, প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও এর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নির্বিঘ্ন ও টোলমুক্ত থাকুক, কিন্তু ইরান মনে করে যুদ্ধের ফলে তারা এ অঞ্চলে নতুন কৌশলগত প্রভাব অর্জন করেছে এবং সেই ভূমিকা বজায় রাখতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রশ্নে নতুন কোনো উত্তেজনা তৈরি হলে তা পুরো শান্তি প্রক্রিয়াকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক স্বার্থ
ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো দ্রুত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফেরত পাওয়া। যুদ্ধের ফলে ইরানের অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়েছে এবং দেশটির নেতৃত্ব দ্রুত অর্থনৈতিক স্বস্তি চায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে ধাপে ধাপে এবং তা নির্ভর করবে ইরান চুক্তির শর্তগুলো কতটা বাস্তবায়ন করছে তার ওপর।
এই বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও সংবেদনশীল। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে অনেক রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন, খুব দ্রুত অর্থনৈতিক সুবিধা দিলে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে কূটনৈতিক সমঝোতা চাইছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে বড় প্রশ্ন
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ইসরায়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরান-সম্পর্কিত কোনো মার্কিন চুক্তি ইসরায়েলের সামরিক সিদ্ধান্তকে সীমাবদ্ধ করবে না।
বিশেষ করে লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। ইরান বলছে, আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি এবং লেবাননে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।
ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা হলেও আঞ্চলিক বাস্তবতা পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
আলোচনার ধরনে বড় পার্থক্য
দুই দেশের কূটনৈতিক সংস্কৃতির পার্থক্যও আলোচনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত দ্রুত ফলাফল প্রত্যাশা করে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করতে চায়। অন্যদিকে ইরান দীর্ঘমেয়াদি দরকষাকষি ও ধাপে ধাপে সমঝোতার কৌশল অনুসরণ করে।
অতীতের বহু আলোচনায় এই পার্থক্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল চুক্তি তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন কাজ।
তুলনামূলকভাবে, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্ত করতে প্রায় দুই বছর ধরে ধারাবাহিক আলোচনা চালাতে হয়েছিল।
গভীর অবিশ্বাস এখনো কাটেনি
যুদ্ধ এবং দীর্ঘদিনের বৈরিতার কারণে দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। ইরানের অনেক নেতা বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্র সুযোগ পেলেই সামরিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে। অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা সন্দেহ করেন, ইরান সময়ক্ষেপণের কৌশল ব্যবহার করে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বজায় রাখতে চায়।
এই পারস্পরিক সন্দেহের কারণে আলোচনায় ছোটখাটো অগ্রগতিও দ্রুত থেমে যেতে পারে। এমনকি কোনো বিষয়ে মৌখিক সমঝোতা হলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন সংকট দেখা দিতে পারে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ
দুই দেশেই কঠোর অবস্থানের সমর্থক রাজনৈতিক গোষ্ঠী রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইরানবিরোধী কট্টরপন্থীরা মনে করেন, তেহরানকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে ইরানের রক্ষণশীল মহল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতিরিক্ত সমঝোতার বিরোধিতা করছে।
ফলে আলোচকরা কোনো সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছালেও নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক চাপ তাদের অবস্থান কঠোর করতে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, সব জটিলতা সত্ত্বেও উভয় পক্ষই নতুন যুদ্ধ এড়াতে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও আঞ্চলিক অস্থিরতার চাপ মোকাবিলা করছে, আর ইরান সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সমাধান মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির বদলে সীমিত পরিসরের সমঝোতা, অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বা আলোচনার সময়সীমা বাড়ানোর সম্ভাবনাই আপাতত বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যদিও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, তবুও পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর করতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই নতুন শান্তি উদ্যোগ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
/ইউএমএইচ